
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহে একের পর এক শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ, যেন দম ফেলবার ফুরসত নেই। এরই মধ্যে ছোট ছোট কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা হয়তো সবার চোখ এড়িয়ে গেছে। টিকিটের দাম, ভিসা জটিলতা কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের খবরের ভিড়ে এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো ফুটবলের ভিন্ন এক রূপ তুলে ধরেছে।
ইতালির কিংবদন্তি কোচ আরিগো সাক্কি একবার বলেছিলেন, “ফুটবল হলো সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”
এই ফুটবলই আসলে মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতার চাপ থেকে মুক্তি দেয়। চলুন দেখে নেওয়া যাক বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহের সবচেয়ে মজার ও বিচিত্র ১১টি ঘটনা।
১. বিশ্বকাপের মাসকট সেজে মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার
মাদকবিরোধী অভিযানে জড়িয়ে গেছে বিশ্বকাপের মাসকট! এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরতে পুলিশ জানতে পারে, তিনি বিশ্বকাপ-পাগল।
তাই কর্মকর্তারা ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল মাসকটের পোশাক পরে তাঁর কাছে যান। সন্দেহ না জাগিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
ঈগল আর মুজ সেজে পুলিশ সদস্যদের একজন অভিযুক্তকে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন—এমন দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

সাপ আতঙ্কে ওয়ার্নিং সাইন
২. ‘স্নেক গেট’ : বিশ্বকাপে সাপ আতঙ্ক
এবারের বিশ্বকাপে আশ্চর্যজনকভাবে সাপ একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সুইজারল্যান্ডের দল প্রথমে মজা করে দাবি করেছিল, তাদের ক্যালিফোর্নিয়ার ট্রেনিং ক্যাম্পের আশপাশে প্রচুর সাপ রয়েছে। পরে জানা যায়, এটি সাংবাদিকদের সঙ্গে করা রসিকতা ছিল।
কিন্তু জার্মানির ক্যাম্পে সত্যিই বিষধর সাপ দেখা যায়। জার্মান অধিনায়ক যোশুয়া কিমিখ বলেন, “গতকাল আমরা একটি সাপ দেখেছি। আমাদের বলা হয়েছে এটি বিষধর। কামড়ালে হাসপাতালে যেতে হবে। হয়তো মারা যাব না, কিন্তু বিপজ্জনক তো বটেই।”
এদিকে নরওয়ের মিডফিল্ডার ক্রিস্টিয়ান থর্সভেদ্ত জানতে পারেন তাঁর দলও একই ধরনের এলাকায় অবস্থান করবে। তাঁর সরল প্রতিক্রিয়া—
“এই খবর শুনে আমি মোটেও খুশি নই।”

গাঁজার কাপ বং
৩. ‘বিশ্বকাপ ট্রফি বং’-এর করুণ পরিণতি
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সম্প্রতি বলেছিলেন, মানুষ যেন আনন্দ করতে ভুলে যাচ্ছে। তবে ফিফা মনে করেছে কেউ কেউ হয়তো একটু বেশিই আনন্দ করছে। টরন্টোর একটি পারিবারিক গাঁজার দোকানে বিশ্বকাপ ট্রফির আকৃতির একটি মারিজুয়ানা বং প্রদর্শন করা হয়েছিল।
ফিফা দ্রুত আইনি নোটিশ পাঠিয়ে জানায়, তারা অনুমতি ছাড়া ফিফার ট্রেডমার্ক ব্যবহার করছে। ফলে দোকানের দুই মালিক ভিডিও করে নিজেরাই ট্রফি-আকৃতির বংটি ধ্বংস করেন।
একজন মালিক আক্ষেপ করে বলেন, “দুঃখজনকভাবে, বিশ্বকাপ ট্রফি বংয়ের এখানেই সমাপ্তি।”

৪. আর্জেন্টিনার ‘ভিসা সান্ত্বনা পুরস্কার’
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করতে ভক্তরা কতদূর যেতে পারে, তা কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু মার্কিন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সামনে আসলে আবেগেরও সীমা আছে।
অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থকের ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার পর দেশটির প্রতিষ্ঠান নিউজান একটি অভিনব উদ্যোগ নেয়।
গত ছয় মাসে যাদের মার্কিন ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রথম ১০০ জনকে বিনামূল্যে একটি করে টেলিভিশন দেওয়া হয়, যাতে তারা অন্তত বাসায় বসে বিশ্বকাপ দেখতে পারেন।
২৪ বছর বয়সী তোমাস ভাগেলার বলেন,
“আমরা সবাই ভাবছি, এটা হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। মাঠে গিয়ে দেখতে না পারাটা খুব কষ্টের। তবে অন্তত একটা উপহার নিয়ে ফিরছি।”

জাপানের টাইম ক্রাইসিস
৫. জাপানের ‘ঘড়ি সংকট’
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জাপানের ২-২ ড্র ম্যাচে এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দেয়। টেক্সাসের এ টি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামের বিশাল স্ক্রিন দর্শকেরা দেখতে পেলেও মাঠের খেলোয়াড়েরা সেটি দেখতে পাচ্ছিলেন না। ফলে জাপানি খেলোয়াড়েরা বারবার জানতে চাইছিলেন—“এখন কত মিনিট?”
শেষ পর্যন্ত কোচিং স্টাফ সাদা বোর্ডে মিনিট লিখে খেলোয়াড়দের দেখাতে শুরু করেন। তাই কোচ হাজিমে মোরিয়াসুকে বারবার “৪৫”, “২”, “৩” ইত্যাদি লেখা বোর্ড তুলে ধরতে দেখা যায়।
অবশেষে জাপান ৮৮ মিনিটে সমতা ফিরিয়ে আনে—যে ঘড়ি তারা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছিল না, তার সময় মেপেই।

রিখটার স্কেলে হালান্ডের গোলের পরের অবস্থা
৬. হালান্ডের গোলে ভূমিকম্প!
নরওয়ের তারকা এরলিং হালান্ড বিশ্বকাপে নিজের প্রথম দুটি গোল করেন কিন্তু গোলের চেয়েও বেশি আলোচনায় আসে অন্য একটি বিষয়।
নরওয়ের বার্গেন শহরে তাঁর গোল উদযাপনের সময় এত মানুষ লাফালাফি করেছিলেন যে ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে তার প্রভাব ধরা পড়ে। গবেষকেরা জানান, ২০২৪ সালের পর এমন কম্পন আর দেখা যায়নি। মজার ব্যাপার হলো, সেই আগের কম্পনের কারণ ছিল একটি এড শিরান কনসার্ট!
৭. স্কটিশ সমর্থকদের ‘পানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ’
বস্টনে স্কটল্যান্ডের সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল উৎসবমুখর। কিন্তু সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটে একটি পানীয়ের দোকানে। এক নারী দোকানে ঢুকে দুটি পানির বোতল কেনেন।
দোকানে উপস্থিত ১৫ থেকে ২০ জন স্কটিশ সমর্থক তখন তাঁকে দুয়োধ্বনি দিতে শুরু করেন।
কারণ? তাদের মতে, এমন পরিবেশে পানি কেনা প্রায় অপরাধের সামিল!

৮. বিশ্বকাপের প্রথম মা-ছেলের জুটি
ইরান ও নিউজিল্যান্ডের ম্যাচে মাত্র চার মিনিট খেললেও টাইলার বাইন্ডন ইতিহাস গড়ে ফেলেন।
তার মা জেনি বাইন্ডন ২০০৭ ও ২০১১ সালে নিউজিল্যান্ড নারী দলের গোলরক্ষক ছিলেন।
ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই পরিবার থেকে মা ও ছেলে—দুজনই বিশ্বকাপে খেলার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
৯. পানি নয়, মাঠে ছিটালো বালি!
নরওয়ে ও ইরাক ম্যাচের বিরতিতে গিলেট স্টেডিয়ামে ঘটে আরেক বিচিত্র ঘটনা।
মাঠে পানি ছিটানোর স্প্রিংকলার হঠাৎ করে পানি নয়, বালি ছুড়তে শুরু করে।
ফলে মাঠের একটি অংশ ছোটখাটো জলাভূমির বদলে বালুময় এলাকায় পরিণত হয়।
মজার বিষয় হলো, দ্বিতীয়ার্ধে সেই দিকের গোলে আর কোনো গোলই হয়নি।

ভোজিনহা
১০. বিশ্বকাপের কারণে ভলিবল প্রতিযোগিতা স্থগিত!
কাবো ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর নিজ দেশে আরেক কারণে আলোচনায় আসেন।
প্রতি বছর যে বিচ ভলিবল প্রতিযোগিতায় তাঁর অংশ নেওয়ার কথা, এবার সেখানে তিনি থাকতে পারবেন না।
কারণ?
তিনি বিশ্বকাপে ব্যস্ত!
তবে গল্পের সবচেয়ে আবেগঘন অংশ ছিল তাঁর মা আনা কান্দিদা এভোরাকে ঘিরে। ভিসা ও জামানতের জটিলতার কারণে তিনি ছেলের খেলা দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি।
ম্যাচ শেষে ভোজিনহা বলেন, “আমি কেঁদেছিলাম কারণ আমার মা এখানে আসতে পারেননি।” পরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগে তাঁর জন্য ভিসা-সংক্রান্ত বাধা দূর করা হয়।
১১. বিশ্বকাপ গড়ে দিল নতুন বন্ধুত্ব
আলজেরিয়া দল যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের লরেন্স শহরে ঘাঁটি গেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন যে কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
শুধু আলজেরিয়াই নয়, ইংল্যান্ড, ইরানসহ অনেক দলের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কোথাও সমর্থকেরা খেলোয়াড়দের অটোগ্রাফ নিচ্ছেন, কোথাও আবার নিজেদের শহরের দল হিসেবেই গ্রহণ করে নিচ্ছেন বিদেশি দলগুলোকে।
বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহ তাই শুধু গোল, জয়-পরাজয় কিংবা পয়েন্ট টেবিলের গল্প বললে অত্যুক্তি হবেই। এটি ছিল সাপের আতঙ্ক, ভাঙা বং, মাসকট সেজে গ্রেপ্তার অভিযান, মায়ের জন্য কান্না, ভুল করে বলা ‘কাওয়াসাকি’-র মতোই এক বিচিত্র মেলার নাম। ফুটবল মাঝে মাঝে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—খেলার বাইরের গল্পগুলোও কখনও কখনও অবিস্মরণীয় অনুভূতিপ্রবণ হয়ে ওঠে।








































