
ডেনিজ উনদাভ
কয়েক মাস আগেও জার্মানির কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের প্রকাশ্য সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। আর এখন সেই ডেনিজ উনদাভ জার্মানির বিশ্বকাপ অভিযানের অন্যতম বড় ভরসা।
শনিবার আইভরি কোস্টের বিপক্ষে নাটকীয় ২-১ গোলের জয়ে বদলি হিসেবে নেমে জোড়া গোল করেন উনদাভ।
জার্মানির দুই ম্যাচেই বদলি হিসেবে নেমে তিন গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন ২৯ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের পর বদলি খেলোয়াড় হিসেবে এত কম ম্যাচে পাঁচটি গোল-অবদান রাখার কীর্তি আর কারও নেই। এই রেকর্ডে তিনি ছুঁয়েছেন ১৯৯০ বিশ্বকাপের ক্যামেরুন কিংবদন্তি রজার মিলাকে।
কোচের সমালোচনা থেকে নায়ক
মার্চে ঘানার বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল করেছিলেন উনদাভ। এরপর জাতীয় দলে নিয়মিত একাদশে জায়গা পাওয়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন তিনি।
কিন্তু জার্মানির কোচ নাগেলসমান তখন মন্তব্য করেছিলেন, উনদাভ নিজের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, শুরু থেকে খেললে হয়তো সেই গোলটিও করতে পারতেন না উনদাভ। পরে অবশ্য কোচ স্বীকার করেন, ওই মন্তব্যের জন্য তিনি ক্ষমা চেয়েছেন।
এরপর থেকে মুখে নয়, মাঠেই জবাব দিয়ে চলেছেন উনদাভ। বর্তমানে জাতীয় দলের হয়ে ১১ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯।
আইভরি কোস্ট ম্যাচের পর নাগেলসমানও স্বীকার করেছেন, বৃহস্পতিবার ইকুয়েডরের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে উনদাভকে শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে।
যে ছেলেটিকে বলা হয়েছিল, ‘তোমার ভবিষ্যৎ নেই’
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোল করে উনদাভ জার্মানির প্রথম ফুটবলার হিসেবে নিজের প্রথম দুই বিশ্বকাপ ম্যাচেই গোল করার কীর্তি গড়েছেন। এর আগে ২০০২ সালে এমন করেছিলেন মিরোস্লাভ ক্লোসে।
উনদাভের আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে অসাধারণ সংগ্রামের গল্প। একসময় বিশ্বকাপে খেলা ছিল তার কাছে কল্পনারও বাইরে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে জার্মান ক্লাব ভের্ডার ব্রেমেন তাকে জানিয়ে দেয়, তিনি খুব খাটো হওয়ায় ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তিনি নেই। ক্লাবের সেই প্রত্যাখ্যান তাকে রীতিমতো ভেঙে দিয়েছিল।
১৭ বছর বয়সে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব হাভেলসে তে যোগ দেন উনদাভ। তখন সপ্তাহে মাত্র ১২০ পাউন্ড আয় করতেন। ফুটবল খেলার পাশাপাশি দিনে আট ঘণ্টা একটি কারখানায় লেজার মেশিন চালানোর কাজ করতেন।
উনদাভ পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠতাম। কারখানায় কাজ করতাম, তারপর অনুশীলনে যেতাম। রাত ৮টার দিকে বাসায় ফিরতাম। পরদিন আবার একই রুটিন। শুধু ফুটবলের টাকায় জীবন চালানো সম্ভব ছিল না, তাই কাজ করতেই হতো।’
বেলজিয়াম থেকে প্রিমিয়ার লিগ, তারপর বিশ্বকাপ
২০২০ সালে বেলজিয়ামের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়েজে যোগ দেন উনদাভ। দলকে শীর্ষ লিগে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। পরে এক মৌসুমে ২৫ গোল করে নজর কাড়েন এবং ইংলিশ ক্লাব ব্রাইটনে যোগ দেন।
তবে প্রিমিয়ার লিগে প্রথম মৌসুমে ২২ ম্যাচে মাত্র পাঁচ গোল করায় তাকে ধারে পাঠানো হয় স্টুটগার্টে। পরে জার্মান ক্লাবটি তাকে স্থায়ীভাবে দলে ভেড়ায়।
২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১৯ গোল করে গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় হন উনদাভ। কেবল ইংলিশ তারকা ফুটবলার হ্যারি কেইন ছিলেন তার ওপরে। আর সেই পারফরম্যান্সই তাকে বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে দেয়।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত কুরাসাও ও আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচে জার্মানির মূল স্ট্রাইকার ছিলেন কাই হাভার্টজ। তবে উনদাভের দুর্দান্ত ফর্মের কারণে কোচকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
আইভরি কোস্ট ম্যাচে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতার পর উনদাভ বলেছেন, ‘এটা অসাধারণ অনুভূতি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা জিতেছি এবং পরের রাউন্ডে উঠেছি।’
কারখানার শ্রমিক থেকে বিশ্বকাপের নায়ক—ডেনিজ উনদাভের যাত্রা ইতোমধ্যেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। আর যদি তিনি এই ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তাহলে জার্মানির পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্নেও বড় ভূমিকা রাখতে পারেন এই সুপার-সাব তারকা।
বাংলা টেলিগ্রাফ স্পোর্টস- বিটিএস













































