
বিশ্বকাপের স্মরণীয় মুহূর্ত
চলছে ২০২৬ বিশ্বকাপ।
প্রতি চার বছর পরপর ফিফা এমন এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করে, যা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বিশ্বের সংবাদপত্রগুলোর শিরোনাম দখল করে নেয়। এর প্রধান কারণ অবশ্যই মাঠের খেলা।
তবে প্রায়ই এমন কিছু মুহূর্ত জন্ম নেয়, যা ফুটবল ছাড়িয়ে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও মানবিক আবেগের অংশ হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসকে বদলে দেওয়া তেমনই দশটি স্মরণীয় ঘটনার দিকে ফিরে তাকানো যাক।
১. ফ্রান্স ১৯৩৮ – মুসোলিনির ‘ব্ল্যাকশার্ট’দের জয়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর মাত্র এক বছর আগে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় বিশ্বকাপ। তখন ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছিল।
১৯৩৪ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জেতা ইতালি এবারও অন্যতম ফেবারিট হিসেবে টুর্নামেন্টে আসে। কিন্তু তারা তো আর তখন সাধারণ কোনো ফুটবল দল নয়; তারা ছিল বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রতিনিধিও।
কোচ ভিত্তোরিও পোজ্জো দলের ওপর এক রকম সামরিক শৃঙ্খলা আরোপ করেছিলেন এবং ফুটবলকে শাসকগোষ্ঠীর প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ থেকেই উত্তেজনার শুরু। ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলতে নামার সময় ইতালীয়রা কালো জার্সি পরে এবং ফ্যাসিবাদী সালাম জানায়। দর্শকদের তীব্র দুয়োধ্বনিতে স্টেডিয়াম কেঁপে ওঠে। সেই দৃশ্য বিশ্বকাপ ইতিহাসে রাজনীতির সবচেয়ে স্পষ্ট হস্তক্ষেপগুলোর একটি হয়ে আছে।
বিতর্ক সত্ত্বেও ইতালি ফাইনালে উঠে হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় শিরোপা জিতে নেয়। ফ্যাসিবাদী সরকার এই জয়কে জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলেও এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রাজনৈতিক ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
২. ব্রাজিল ১৯৫০ — ‘মারাকানাজো’: স্বাগতিকদের হৃদয়ভঙ্গ
১৯৫০- বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাগুলোর একটি উপহার দেয়, মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে হারিয়ে উরুগুয়ে অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে আনে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন, যদিও অনেকের ধারণা প্রকৃত সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ।
তৎকালীন প্রতিযোগিতা পদ্ধতিতে ব্রাজিলের শুধু একটি ড্র-ই যথেষ্ট ছিল শিরোপা জয়ের জন্য। রিও ডি জেনেইরো তখন উৎসবমুখর। সংবাদপত্রে বিজয়ের শিরোনাম প্রস্তুত, গান লেখা হয়ে গেছে, সমর্থকেরা নিশ্চিত ছিলেন কাপ তাদেরই।
দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল এগিয়েও যায়। কিন্তু উরুগুয়ে হার মানেনি। হুয়ান আলবার্তো স্কিয়াফিনো সমতা ফেরান। ম্যাচ শেষ হওয়ার ১১ মিনিট আগে আলসিদেস গিগিয়া গোল করে পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেন।
মুহূর্তেই নেমে আসে নীরবতা। ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়েরা ভেঙে পড়েন, গোটা দেশ শোকে ডুবে যায়। ‘মারাকানাজো’ আজও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি, আর উরুগুয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি।
৩. স্পেন ১৯৮২ — ‘ম্যাজিকো’ গঞ্জালেসও রক্ষা করতে পারেননি এল সালভাদরকে
১৯৮২ বিশ্বকাপে এল সালভাদরকে ১০-১ গোলে বিধ্বস্ত করে হাঙ্গেরি। এটি আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের রেকর্ড।
গৃহযুদ্ধ ও নানা সংকটে জর্জরিত এল সালভাদরের জন্য ম্যাচটি ছিল এক দুঃস্বপ্ন। তবে সেই অন্ধকারের মাঝেও আসে একটি উজ্জ্বল মুহূর্ত।
লুইস রামিরেস বিশ্বকাপে এল সালভাদরের প্রথম গোলটি করেন। গোলটি আনন্দের চেয়ে মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এ সময় দলের একমাত্র পেশাদার ফুটবলার হোর্হে আলবার্তো গঞ্জালেস বারিয়াস, যিনি ‘ম্যাজিকো গঞ্জালেস’ নামে পরিচিত, তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং ও সৃজনশীল ফুটবলে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
পরাজয় সত্ত্বেও এই বিশ্বকাপ এল সালভাদরের জন্য হয়ে ওঠে সংগ্রামী এক জাতির আত্মপ্রকাশের গল্প।
৪. মেক্সিকো ১৯৮৬ — ‘ঈশ্বরের হাত’
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের কোয়ার্টার-ফাইনাল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের রেশ তখনও তাজা। রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা হাত দিয়ে বল জালে জড়িয়ে গোল করেন। ইংলিশ খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও রেফারি গোলটি বৈধ ঘোষণা করেন। পরে মারাদোনা একে আখ্যা দেন—‘ঈশ্বরের হাত’।
কিন্তু মাত্র ছয় মিনিট পর তিনি যা করেন, সেটিই তাঁকে অমর করে দেয়।
নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে শুরু করে একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন মারাদোনা। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলগুলোর একটি হিসেবে এটি বিবেচিত হয়।
আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতে ফাইনালে ওঠে এবং পরে জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা জেতে।
৫. যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪ — যে ভুলের মূল্য ছিল জীবন
১৯৯৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার অধিনায়ক আন্দ্রেস এস্কোবার একটি আত্মঘাতী গোল করেন। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সেই গোলই দলটির বিদায় ত্বরান্বিত করে।
কয়েক দিন পর নিজ শহর মেডেলিনে একটি বারের বাইরে গুলিতে নিহত হন তিনি। বয়স ছিল মাত্র ২৭।
এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে স্তম্ভিত করে। মাদক চক্র, অবৈধ জুয়া এবং ভয়াবহ সামাজিক সহিংসতায় আক্রান্ত কলম্বিয়ার এক অন্ধকার বাস্তবতার প্রতীক হয়ে ওঠে ঘটনাটি।
‘ফুটবলের ভদ্রলোক’ নামে পরিচিত এস্কোবার বিশ্বাস করতেন ফুটবল মানুষের সহাবস্থান ও মূল্যবোধের ক্ষেত্র হতে পারে। তাঁর মৃত্যু আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—তাঁকে ফুটবল নয়, সমাজই হত্যা করেছিলো।
৬. জার্মানি ২০০৬ — জিদানের হেডবাট
২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর দৃশ্যের সাক্ষী।
এটি ছিল জিনেদিন জিদানের পেশাদার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। ফাইনালে প্যানেঙ্কা স্টাইলে পেনাল্টি থেকে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়েও দেন তিনি।
কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জির সঙ্গে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হঠাৎ মাথা দিয়ে আঘাত করেন জিদান। লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে।
নেতাকে হারিয়ে ফ্রান্স টাইব্রেকারে পরাজিত হয়।
বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে একা ড্রেসিংরুমে ফিরে যাওয়ার সেই দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতীকী ছবিগুলোর একটি হয়ে আছে—একজন কিংবদন্তির গৌরবময় অথচ মানবিক বিদায়।
৭. দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ — ইনিয়েস্তার ‘জীবনের সেরা গোল’
স্পেন তাদের অনন্য ‘টিকি-টাকা’ ফুটবল দিয়ে ২০১০ বিশ্বকাপ জয় করে।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু হলেও ভিসেন্তে দেল বস্কের দল ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায়। বলের দখল, ধৈর্য ও কৌশলগত ফুটবল দিয়ে তারা ফাইনালে পৌঁছে যায়।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফাইনাল ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও কঠিন।
ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখন অতিরিক্ত সময়ের ১১৬তম মিনিটে সেস ফ্যাব্রেগাসের পাস থেকে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা গোল করেন।
সেই একমাত্র গোলেই স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
এই গোল শুধু একটি শিরোপা নয়; এটি ফুটবল দর্শনের এক যুগের প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে এই বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস এর একটি বৈধ গোল স্পষ্ট টিভি রিপ্লে তে ধরা পরবার পরেও দেননি। দুর্ভাগ্য নেদারল্যান্ড এর। সেই ম্যাচ আজও ফুটবলপ্রেমীদের মানসপটে দাগ কাটে।
৮. ব্রাজিল ২০১৪ — পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নের ঐতিহাসিক বিপর্যয়
২০১৪ সালের ৮ জুলাই বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য রাত নেমে আসে।
বেলো হরিজন্তের সেমিফাইনালে জার্মানি স্বাগতিক ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে।
ম্যাচের ২৩ থেকে ২৯ মিনিটের মধ্যে জার্মানি চারটি গোল করে। মিরোস্লাভ ক্লোসা বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন, আর টনি ক্রুস জোড়া গোল করেন।
ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা হতবাক হয়ে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছেন।
এটি ছিল ৭৬ বছরে ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল পরাজয় এবং প্রায় এক শতকে ঘরের মাঠে তাদের সবচেয়ে বড় হার।
‘মিনেইরাজো’ আজও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের এক জাতীয় ট্রমার নাম।
৯. রাশিয়া ২০১৮ — ভিএআর-এর আবির্ভাব
২০১৮ বিশ্বকাপ প্রথম বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট, যেখানে ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গ্রুপ পর্ব থেকেই ভিএআর নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তবে অনেকের মতে, এর ফলে রেফারিং আরও নির্ভুল ও ন্যায়সঙ্গত হয়েছে।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ৪০০-এরও বেশি ঘটনায় প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হয় এবং সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯.২ শতাংশে।
অফসাইড গোল কমে যায়, গুরুত্বপূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধিত হয়, এবং রেকর্ডসংখ্যক পেনাল্টি দেখা যায়।
বিতর্ক থাকলেও রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রযুক্তির নতুন যুগের সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
১০. কাতার ২০২২ — অবশেষে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মেসি
কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালকে অনেকেই ইতিহাসের সেরা ফাইনাল বলে মনে করেন।
আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের ম্যাচটি অতিরিক্ত সময় শেষে ৩-৩ গোলে ড্র হয়। এরপর টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
এটি ছিল দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকা—লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের অবিস্মরণীয় দ্বৈরথ।
মেসির পেনাল্টি ও আনহেল দি মারিয়ার গোলে আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এমবাপ্পে দুটি গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান।
অতিরিক্ত সময়ে মেসি আবার গোল করেন। কিন্তু এমবাপ্পে পেনাল্টি থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে ম্যাচকে টাইব্রেকারে নিয়ে যান।
সেখানে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ নায়ক হয়ে ওঠেন। আর্জেন্টিনা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে।
আর লিওনেল মেসি অবশেষে জিতে নেন সেই একমাত্র শিরোপা, যা তাঁর ক্যারিয়ারে এতদিন অধরা ছিল—বিশ্বকাপ।












































