রবিবার । জুন ২১, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ২১ জুন ২০২৬, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

বাবা দিবস বিশেষ

নিরুদ্বেগ মুখ, উদ্বিগ্ন মন— বাংলা সাহিত্যের বাবারা


baba cover

বাবার চুপ থাকা মানে রাগ, কখন তার মানে দুশ্চিন্তা, কখনো বা শুধু ক্লান্তি। বাংলা সাহিত্যের বাবারা এই ভাষাতেই কথা বলে গেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম

বাবা কথা বলেন না। অন্তত বাংলা সাহিত্যে যত বাবা পাওয়া যায়, তাদের বেশিরভাগই খুব একটা কথা বলেননি। দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে থাকতেন। খবরের কাগজের আড়ালে মুখ ঢাকতেন। রাতের খাবার টেবিলে চুপচাপ ভাত মাখতেন। যা বলার, না বলেই বলে দিতেন।

এই নৈঃশব্দ্যটা আসলে একটা ভাষা, যদিও শব্দহীন। সন্তান বড় হয়ে বুঝতে শেখে এই ভাষার ব্যাকরণ — কখনো বাবার চুপ থাকা মানে রাগ, কখনো তার মানে দুশ্চিন্তা, কখনো বা শুধু ক্লান্তি। বাংলা সাহিত্যের বাবারা এই ভাষাতেই কথা বলে গেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম, আর লেখকরা সেই নীরবতাকেই অনুবাদ করেছেন পাঠকের জন্য।

এগারো বছর বয়স তখন রবীন্দ্রনাথের। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছেলেকে নিয়ে রওনা দিলেন— কলকাতা ছেড়ে কয়েক মাসের ভারত ভ্রমণে, ডালহৌসির হিমালয় হিল স্টেশনের দিকে। আদিখ্যেতা ছিল না সেখানে, নরম কথাও নয়। একটা সিদ্ধান্ত ছিল শুধু, একটা পথ। ছেলেকে একা থাকতে শেখানো, নিজের সাথে নিজের পরিচয় করানো — বাবার ভাষা এটাই, যেখানে ‘ভালোবাসি’ শব্দটার দরকার পড়ে না কোনোদিন।

দেশভাগের সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাবাকে দেখেছিলেন অন্যভাবে। ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর ছিন্নমূল পরিবারগুলোয় বাবা একরকম বাঁধের মতো— সব ভেঙে পড়তে দেখেও যাঁরা নিজেরা ভাঙেন না, অন্তত সন্তানের সামনে নয়। প্রতাপের মতো চরিত্রের ভেতর দিয়ে একটা জিনিস ফিরে আসে বারবার। রাজনীতি আর সংসার যখন একসাথে ধসে পড়ে, বাবার কাজ তখন একটাই থাকে— নিজের ভয়টা গিলে ফেলা, সন্তানকে বিশ্বাস করানো যে দুনিয়াটা এখনও নিরাপদ। একরকম অভিনয়, যদিও বোধহয় সবচেয়ে সৎ অভিনয়টাই এই।

বাবা চরিত্রটা সবচেয়ে বিপজ্জনক মোড় নেয় হুমায়ূন আহমেদের জগতে। হিমু সিরিজের বাবা একজন উন্মাদ মরমী সাধক, ছেলেকে ‘মহাপুরুষ’ বানানোর নেশায় বুঁদ। নিজের জবানিতেই হিমু একদিন বলে ফেলে, তাঁর বাবা খুব ঠান্ডা মাথায় এগিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন মা বেঁচে থাকলে এই প্রশিক্ষণে রাজি হতেন না, তাই মাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। একটা লাইনই যথেষ্ট এখানে। ভালোবাসা যখন আদর্শ হয়ে যায়, সন্তান তখন মানুষ থাকে না আর, হয়ে যায় একটা প্রজেক্ট। হুমায়ূন নিজেও বাবা হারিয়েছিলেন কম বয়সে— বাবা ফয়জুর রহমান আহমদ পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শহীদ হন। যে বাবা নেই, সম্ভবত তাঁকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি লেখা যায়। অনুপস্থিতিও একরকম উপস্থিতি, হয়তো সবচেয়ে ঘন উপস্থিতি।

জমিদার হেমকান্তের গল্প একটু অন্যরকম। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘দূরবীন’-এ তিনি তিন প্রজন্মের প্রথম পুরুষ, মেয়ে রেমির চোখে যিনি একটা রহস্য, একটা দূরত্ব। রেমির অনুভূতি বাবার প্রতি অপরিসীম ঔদাসীন্য আর চরম বিতৃষ্ণার মধ্যে দিয়ে এগোয়। তাঁর জীবনের গোপন অধ্যায়গুলো মেয়ের কাছে পৌঁছায় শুধু সন্দেহ আর দূরত্বের চেহারায়। সম্পর্কটাকে রোম্যান্টিক করেননি শীর্ষেন্দু কোথাও। কাছের মানুষও অচেনা থেকে যেতে পারে — এটাই দেখিয়েছেন, শুধু না-বলা কথার পাহাড়ে। কখনো কখনো রক্তের সম্পর্কও দূরত্ব ঘোচাতে পারে না, বরং আরও স্পষ্ট করে দেয় সেই ফাঁকটা।

baba inner

সবচেয়ে করুণ বাঁক বোধহয় অনিমেষের। ‘কালবেলা’র শেষে তাঁর দুই হাত যেন নরম কাদা, ইচ্ছেমতো মূর্তি গড়া যায় যা দিয়ে। ‘কালপুরুষ’-এ এসে সমরেশ মজুমদার দেখান, অনিমেষ টের পান একটা সত্যি— সন্তান মূর্তি নয়। নিজের নকশাল আদর্শ, সমাজতান্ত্রিক স্বপ্ন, সবকিছু ছেলে অর্কর মধ্যে দিয়ে বাঁচাতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু অর্ক বড় হয় অন্য পথে। ঘুমচোখে একদিন বাবাকে বলে দেয়, ‘ফোটো তো, ন্যাকড়াবাজি করো না।’ আদর্শ দিয়ে সন্তান গড়া যায় না— নির্মম সত্যটা এখানেই ধরা পড়ে যায়। সন্তান নিজের পথ নিজেই খোঁজে, বাবার হাতে থেকে যায় শুধু অপেক্ষা।

বাবার এই নিরুদ্বেগতার পেছনে একটা ভয় থাকে সবসময়, যা সাহিত্য খুব কম সময়ে সরাসরি বলে। ভয়টা এই— সন্তান যদি একবার দেখে ফেলে বাবা কাঁপছেন, তাহলে আর কোনোদিন নিশ্চিন্ত হতে পারবে না। তাই মুখ শক্ত রাখা, গলা স্বাভাবিক রাখা, এসবই একরকম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দেবেন্দ্রনাথ পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ছেলেকে, কিন্তু নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব কোনোদিন প্রকাশ করেননি সামনাসামনি। প্রতাপ ভয় পেতেন, কিন্তু সেই ভয় ঘরের বাইরে রেখে আসতেন। হিমুর বাবা তো ভয়টাকেই আদর্শে বদলে ফেলেছিলেন, যেন ভয় স্বীকার করলে নিজের প্রজেক্ট ভেঙে পড়বে।

এই জায়গাতেই বাংলা সাহিত্যের বাবারা একে অপরের আত্মীয় হয়ে যান, যদিও লেখক আলাদা, সময় আলাদা, ভাষাও আলাদা। হেমকান্তের নিঃশব্দতা আর অনিমেষের ভাঙা আদর্শবাদ— দুটোই একই গাছের ফল, শুধু শাখা আলাদা। সন্তান বড় হয়ে বুঝতে পারে দেরিতে, বাবার সেই কঠিন মুখোশটা আসলে একটা আড়াল ছিল মাত্র, ভেতরে অন্য একজন মানুষ বসে কাঁদছিলেন বহুদিন। আর এই দেরিতে বোঝাটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি— যখন বোঝার সময় আসে, তখন প্রশ্ন করার মানুষটা আর সামনে থাকেন না, থাকে শুধু স্মৃতি আর কিছু আধখাওয়া কথা।

দেবেন্দ্রনাথের নিরুদ্বেগ পাহাড়যাত্রা, প্রতাপের চাপা ভয়, হিমুর বাবার বিপজ্জনক আদর্শবাদ, হেমকান্তের গোপন রহস্য, অনিমেষের ভাঙা স্বপ্ন— আলাদা যুগ, আলাদা গল্প, কিন্তু সুতোটা কোথাও একরকম থেকে যায়। মুখ শান্ত, ভেতরে ঝড়। কেউ এখানে নায়ক নয় পুরোপুরি, কেউ খলনায়কও নয়।

ভালোবাসা সবসময় কথায় ধরা পড়ে না। একজন মানুষ নিজের সব ভাঙাচোরা কষ্ট চেপে রাখছেন সন্তানের সামনে, যাতে সন্তান আরেকটু বেশিদিন বিশ্বাস করতে পারে — পৃথিবীটা নিরাপদ, আর বাবা মানুষ নন, একটা দেয়াল। অপরাজেয়।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প