
সিনেমা তখন শুধু পর্দার ভেতরে ছিল না, মানুষের জীবনেও ছিল একটু বেশি
এমন একটা সময় ছিল, যখন সিনেমা দেখা মানে শুধু একটা ছবি দেখা নয়, পুরো একটা আয়োজন ছিল। সেই আয়োজনের ভেতরে ছিল অপেক্ষা, উত্তেজনা, ভাগাভাগি করে আনন্দ নেওয়া, আর ছোট ছোট কিছু রীতি—যেগুলো এখন প্রায় হারিয়েই গেছে।
পাড়ার মোড়ে বা বাজারের ভেতরে ছোট্ট একটা ক্যাসেট কিংবা সিডি-ডিভিডির দোকান থাকত। দোকানের সামনে ঝুলত রঙচটা পোস্টার। কোথাও শাহরুখ হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কোথাও সালমানের সানগ্লাস, কোথাও আবার অমিতাভের গম্ভীর মুখ। দোকানের ভেতরে সারি সারি প্লাস্টিকের বক্স। নতুন সিনেমা এলে দোকানদার একটু আলাদা ভঙ্গিতে বলত, ‘ভাই, এইটার কিন্তু একদম প্রিন্ট কিলিয়ার।’
একটা সিনেমা আনার ভেতরেও তখন আলাদা আনন্দ ছিল। কে যাবে দোকানে, কোন সিনেমা আনা হবে, অ্যাকশন নাকি কমেডি—এসব নিয়ে ছোটখাটো পারিবারিক বৈঠক বসে যেত। অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সিনেমাটা অন্য কেউ নিয়ে গেছে শুনে মন খারাপ হতো। তখন বিকল্প হিসেবে এমন কোনো ছবি ভাড়া আনা হতো, যেটার নামও আগে শোনা হয়নি। মজার ব্যাপার হলো, সেই অচেনা সিনেমাগুলোর অনেকগুলোই পরে প্রিয় হয়ে যেত।
ডিভিডির দোকানগুলোরও আলাদা চরিত্র ছিল। কিছু দোকানদার ছিলেন যেন হাঁটাচলা করা সিনেমা বিশ্বকোষ। কে কোন ধরনের সিনেমা পছন্দ করে, কার বাসায় বাচ্চা আছে, কে শুধু অ্যাকশন দেখে, কে আবার কষ্টের বাংলা সিনেমা চায়—সব তাদের জানা। নতুন কোনো ছবি এলে তারা নিজেরাই সাজেস্ট করতেন। কখনও বলতেন, ‘এইটার কিন্তু শেষে টুইস্ট আছে’, আবার কখনও বলতেন, ‘পরিবার নিয়ে দেখতে পারবেন।’ সিনেমা বাছাইয়ের সেই কথোপকথনও অভিজ্ঞতার অংশ ছিল।
অনেক দোকানে আবার নতুন সিনেমা এলে সেটি নিয়ে ছোটখাটো হইচই পড়ে যেত। কেউ আগে থেকে বলে রাখত, ‘ভাই, এইটা কিন্তু অন্য কাউরে দিয়েন না।’ শুক্রবার বিকেলে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন ডিভিডির কভার উল্টেপাল্টে দেখার মধ্যেও একধরনের আনন্দ ছিল। তখন সিনেমা হাতে পাওয়ার আগেই সেটাকে নিয়ে কল্পনা শুরু হয়ে যেত।

সিনেমা তখন একা একা দেখার বিষয় ছিল না, বরং একসঙ্গে সময় কাটানোর একটা অজুহাত ছিল
ভিসিআর বা ভিসিপি তখন শুধু একটা যন্ত্র ছিল না, একধরনের সামাজিক ঘটনা ছিল। পাড়ায় কারও বাসায় নতুন ভিসিআর এলে সেটি প্রায় স্ট্যাটাসের মতো বিষয় হয়ে উঠত। বিশেষ করে ঈদে বা ছুটির দিনে অনেক বাসায় একসঙ্গে সিনেমা দেখার আয়োজন হতো। মেঝেতে পাটি পেতে বসা, কারও হাতে চানাচুর, কারও হাতে চা—আর টিভির সামনে সবাই একসঙ্গে হাসছে বা চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে। সিনেমা তখন একা একা দেখার বিষয় ছিল না, বরং একসঙ্গে সময় কাটানোর একটা অজুহাত ছিল।
অনেক বাসায় আবার সিনেমা শুরু হওয়ার আগেই ছোটখাটো প্রস্তুতি চলত। পর্দা টেনে ঘর অন্ধকার করা, টিভির অ্যান্টেনা একটু ঠিক করা, শব্দ বেশি হলে পাশের বাসার লোকেরা বিরক্ত হবে কি না—এসব নিয়েও আলোচনা হতো। শিশুরা অনেক সময় প্রথম আধঘণ্টা খুব উত্তেজিত থাকত, তারপর কারও কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ত। কিন্তু বড়রা পুরো সিনেমা শেষ না করে উঠতেন না।
অনেকেই ভিসিআরের হেড পরিষ্কার করার ব্যাপারটা মনে করতে পারবেন। ক্যাসেট চলতে চলতে হঠাৎ ছবি ঝাপসা হয়ে গেলে কেউ না কেউ এসে বলত, ‘হেডে সমস্যা করছে।’ তারপর ক্যাসেট বের করে ফুঁ দেওয়া, কাপড় দিয়ে মুছা, আবার চালানো—এসবও যেন অভিজ্ঞতার অংশ ছিল। মাঝে মাঝে ক্যাসেট আটকে যেত, ফিতা পেঁচিয়ে বের হতো। তখন খুব সাবধানে পেন্সিল ঢুকিয়ে রিল ঘোরানোর দৃশ্যও কম পরিচিত ছিল না।
শুক্রবারের বিটিভি ছিল আরেক রকম আবেগ। বিকেলের পর থেকেই একটা অপেক্ষা কাজ করত—আজ বাংলা সিনেমা নাকি ইংরেজি? পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে টিভি দেখার সেই অভ্যাসটা এখনকার দিনে প্রায় কল্পনার মতো লাগে। তখন এত চ্যানেল ছিল না, বিকল্পও কম ছিল। কিন্তু হয়তো সেই কারণেই একটা সিনেমা এত মন দিয়ে দেখা হতো।
বিটিভির বাংলা সিনেমার মাঝখানে বিজ্ঞাপন এলে অনেকে দ্রুত রান্নাঘরে যেত চা আনতে। কেউ বাথরুম সেরে আসত। আবার সিনেমা শুরু হলেই সবাই ছুটে এসে বসত। ইংরেজি সিনেমা হলে তো অন্য রকম উত্তেজনা। নাম ঠিকমতো উচ্চারণ করা না গেলেও পরদিন স্কুলে গিয়ে গল্প হতো—‘কালকের মুভিটা দেখছিস?’
ঈদের সময় টিভি গাইড দেখে আগে থেকেই হিসাব রাখা হতো কোন দিনে কোন সিনেমা দেখাবে। পত্রিকায় ছাপা সেই তালিকায় দাগ দেওয়া থাকত। আজকের মতো তখন ‘যেকোনো সময় দেখে নেয়ার’ সুবিধা ছিল না। একটা সিনেমা মিস মানে সত্যিই মিস।
ভিডিও ক্যাসেটের গায়ে হাতে লেখা নাম, ডিভিডির চকচকে কভার, কিংবা দোকানদারের নিজের হাতে বানানো সংকলন—এসবের মধ্যেও আলাদা একটা সংস্কৃতি ছিল। অনেক দোকানে আবার ‘তিনটা নিলে একটা ফ্রি’ টাইপ অফারও চলত। কেউ কেউ নিজের সংগ্রহও বানাতেন যত্ন করে। তাকভর্তি সিনেমা যেন ছোটখাটো ব্যক্তিগত আর্কাইভ।
তারপর ধীরে ধীরে সিডি গেল, ডিভিডি গেল, ভিসিআর তো আরও আগেই হারিয়ে গেছে। এখন মোবাইলের স্ক্রিনে হাজার সিনেমা হাতের নাগালে। এক ক্লিকেই পাওয়া যায় সবকিছু। সুবিধা বেড়েছে, গতি বেড়েছে, ছবির মানও অনেক ভালো হয়েছে। শুধু সিনেমা দেখার সেই ধীর, সমবেত, অপেক্ষাভরা অনুভূতিটা কোথায় যেন কমে গেছে।
এখন আর শুক্রবার রাতে পুরো পরিবার টিভির সামনে জড়ো হয় না। পাড়ার ভিডিও দোকানগুলোও একে একে হারিয়ে গেছে। যেসব তাক একসময় সিনেমায় ভর্তি থাকত, সেখানে হয়তো এখন মোবাইল কভার বিক্রি হয় কিংবা বিকাশের সাইনবোর্ড ঝুলে থাকে।
তবু মাঝেমধ্যে পুরোনো কোনো সিনেমার গান শুনলে, কিংবা কোথাও ধুলো জমা একটা ভিডিও ক্যাসেট চোখে পড়লে হঠাৎ মনে হয়—সিনেমা তখন শুধু পর্দার ভেতরে ছিল না, মানুষের জীবনেও ছিল একটু বেশি।















































