
ইরানের তারকা স্ট্রাইকার মেহদি তারেমি
বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে ইরান, তবে মাঠের লড়াইয়ের আগেই দলটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক ও চাপ। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের তারকা স্ট্রাইকার মেহদি তারেমি।
সোমবার (স্থানীয় সময়) লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে তারেমি বলেন, ‘এই ধরনের উত্তেজনা বিশ্বকাপের আনন্দকে নষ্ট করে দেয়। আমরা এখানে আসার প্রথম মুহূর্ত থেকেই চাপ অনুভব করেছি। আসলে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আগেই এই পরিস্থিতি শুরু হয়েছিল।’
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতার ঘোষণা এলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। এর প্রভাব পড়েছে ইরান দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতেও।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ইরান তাদের বিশ্বকাপ বেসক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের টুকসন থেকে সরিয়ে মেক্সিকো সীমান্তবর্তী শহর তিহুয়ানায় স্থানান্তর করে। ভিসা জটিলতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইরানের কোচ আমির ঘালেনই বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এসব পরিস্থিতি ফুটবলের চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফুটবল মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার এবং আনন্দ দেওয়ার একটি মাধ্যম। কিন্তু এসব কারণে আমাদের মনোযোগে প্রভাব পড়েছে।’
তিনি জানান, দেরিতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোয় দলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময়ও কম ছিল। তবে খেলোয়াড়দের প্রতিশ্রুতি ও পেশাদারিত্বের ওপর তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
ইরানের প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে। শহরটিতে একটি বড় সংখ্যক প্রবাসী ইরানিরা বাস করেন। এ কারণে ম্যাচটি ঘিরে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তবে অনেক প্রবাসী ইরানি সমর্থক দলকে সমর্থন জানাতে নয়, বরং প্রতিবাদ জানাতে স্টেডিয়ামের বাইরে জড়ো হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারণ ফিফা ইরানের বিপ্লব-পূর্ব ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ পতাকা বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যা অনেক প্রবাসী ইরানির কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় প্রতীক।
প্রবাসী কর্মী আরেজো রাশিদিয়ান বলেন, ‘এটি ইরানের বাইরে সবচেয়ে বড় ইরানি সম্প্রদায়ের শহর। আমরা ফিফার এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করছি এবং ইরানের জনগণের প্রতি সংহতি জানাচ্ছি।’
অনেক প্রবাসী ইরানি বর্তমান ইরানি সরকারের সমালোচক এবং কেউ কেউ জাতীয় দলকে সরকারের প্রতীক হিসেবেও দেখেন। তবে রাশিদিয়ানের মতো অনেকে ম্যাচে উপস্থিত থাকবেন এবং দেশের প্রতি সমর্থন জানাবেন।
অন্যদিকে মেহদি তারেমি জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা বিশ্বের সব প্রান্তে থাকা ইরানিদের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রবাসী কিংবা দেশের ভেতরে থাকা—প্রতিটি ইরানির জন্য খেলি। বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন মতামত থাকতেই পারে। আমাদের কাজ মানুষকে একত্র করা এবং আনন্দ দেওয়া। আমরা রাজনীতিতে জড়াই না।’
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বকাপে ইরান দলের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকা প্রায় অসম্ভব। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান দলের ওপর বিশাল চাপ রয়েছে। ম্যাচের ভেন্যু, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রবাসী ইরানি সম্প্রদায়—সবকিছু মিলিয়ে তারা এক কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
তাদের মতে, রাজনীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দলের প্রতিটি পদক্ষেপই তাদের বর্তমান বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ফলে মাঠে বল গড়ানোর আগেই ইরান দলকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ, স্বাগতিক দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং প্রবাসী ইরানিদের প্রতিবাদের বাস্তবতা।












































