cosmetics-ad

কান পেতে শুনি

বহুত চেষ্টা করেছি ভাই, পারলাম না। অবশেষে এই জীবনকে বেছে নিতে হলো। আপনাদের মত আমারও শখ ছিল। লেখাপড়া করবো, বড় হবো, চাকরি-বাকরি করব…আরো কত কী…!আমার সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ। এখন চোখে শুধু অন্ধকার দেখি … শুধু অন্ধকার। এই কোরিয়ার আকাশ বাতাস সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে…জানেন, আমি ক্লাসে ফাস্ট ছিলাম। এসএসসি তে স্টার মার্ক, ইন্টারেও ভালো করেছি। ইন্টার পরীক্ষার মাঝেই বাবা চলে গেলেন। আর সামনে এগুতে পারলাম না। বাবার ইচ্ছে ছিল আমি ডাক্তার হব। বন্ধুরা সবাই মেডিকেলে ভর্তি কোচিং করল, আমি পারলাম না। কি দিয়ে কোচিং করব? টাকা নাই, পয়সা নাই। ভর্তি হলাম জাতীয় বিশ্ব বিদ্যালয়ে, ফিজিক্সে অনার্স। বাড়ী থেকে টাকা নিতে পারিনি। আমিই বড়, ছোট বোন স্কুলে পড়ে। বাবা ছিলেন পল্লী চিকিৎসক। বাবার অবর্তমানে আয় রোজগারের সব পথ বন্ধ। বাধ্য হয়ে টিউশনি শুরু করলাম।

মেসে থাকি আর টিউশনি করি। মাস শেষে যে টাকা পাই সেখান থেকে বাড়িতেও কিছু পাঠাই। ভালয় চলছিল দিনগুলি।

এক মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতাম। মেয়ের বাবা ছিলেন উকিল। ক্লাস নাইনে পড়তো মেয়েটি। ভরা যৌবন। দেখতে অসম্ভব সুন্দরী! ক’ দিন পর তাকে দেখতে দেখতে অস্থির হয়ে গেলাম। রাতে ঘুমোতে পারিনা, সব সময় সে চোখের সামনে এসে ভীড় করে। প্রথম যেদিন তার হাত ধরলাম, মনে হলো আমার শরীর অবশ হয়ে আসছে…সম্বিত ফিরে পেলাম কিছুক্ষন পর…।

আসলে ভাই, বয়সটা খুব খারাপ ছিল। তাকে এক নজর দেখার জন্য উতলা হয়ে যেতাম। একদিন না দেখলে থাকতেই পারতাম না।

এটাই আমার জীবনের জন্য কাল হলো, কী আর বলব…!

শুধু মেয়েটারই দোষ ছিলো না, আমারও।

মেয়ের মা হয়তো ইচ্ছে করেই সুযোগ করে দিতেন কিছুটা। আমিও জড়িয়ে পড়লাম যাকে বলে ‘লাইলী-মজনু’। দিওয়ানা হয়ে গেলাম। কী আর করার আছে, অবশেষে বিয়ে করে ফেললাম।

তখনও টিউশনি করেই চলি। বাড়িতে এক খন্ড জমি বিক্রি করে বোনটাকে বিয়ে দিলাম। সংসার প্রায় গুছিয়ে নিয়েছি। এখন ছোট-খাটো একখান চকরি হলেই চলবে, ডাল-ভাতের ব্যাবস্থা হলে তাতেই শুকরিয়া।

ফিজিক্সে অনার্স-মাষ্টার্স করে এমপিও ভূক্ত কলেজ গুলোতে খুব ট্রাই করলাম, প্রফেসর হওয়ার শখ। শ্বশুর উকিল, জামাই প্রফেসর হলে খারাপ কী? চেষ্টাও করলাম খুব। কিন্তু ঘুষ ছাড়া যে হয় না ভাই, কী আর করার আছে, বলেন?

অবশেষে শ্বশুর মশাইয়ের শরণাপন্ন হলাম। তার কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা নিলাম, বাদ বাঁকির জন্য কিছু জমি বিক্রি করে ঘুষ দিলাম। প্রায় দুই বছর তীর্থের কাঁকের মত অপেক্ষায় থাকলাম। সরকার পরিবর্তন হলো, আমার টাকাও জলে গেলো।

ইতোমধ্যে আমাদের একটা মেয়ে হলো। ফুটফুটে মেয়ে। দেখতে ঠিক আমার মায়ের মতো। মেয়ের নাম রাখলাম রাত্রি। রাতের বেলায় ক্লিনিকে সিজার করে জন্ম হয়েছিল তাই রাত্রি। এখনও রাত্রি কে নিয়ে আমি অনেক স্বপ্ন দেখি।

চাকরি বাকরি নেই, টই টই করে ঘুরি। শুধু স্বপ্ন দিয়ে তো আর সংসার চলেনা!

এসব নিয়ে প্রায়ই আমার বউয়ের সাথে ঝগড়া হতো। টাকা না থাকলে যা হয়। সম্পদহীন পুরুষের জীবন অন্যের করুণার পাত্র। সংসার জীবনে শুধু ভাব-ভালোবাসা বেশি দিন টেকেনা। অর্থের কাছে আমরা সবাই বন্দী।

কী করব ভেবে পাচ্ছিনা। এক বন্ধুর সহযোগিতার ঢাকায় এলাম। কোরিয়ান ভাষা শিখি আর পার্ট-টাইম জব করি। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো বলতে পারেন। ইপিএস এ চান্স পেলাম। তাঁর পর এ কোরিয়ার প্রবস জীবন।

এখন টাকা-পয়সা ভালই পাই। দেশে পাঠাই। বউ কে পাঠাই। আমার মা’র কাছেও পাঠাই। ভালয় চলছে আমার জীবন। আমি প্রবাসে। পরিবার দেশে। মাঝে মাঝে মনটা হু হু করে কেঁদে উঠে আমার সোনামনি ‘রাত্রি’র জন্য। কিন্তু কিছুই করতে পারিনা। তবুও কাজ থেকে ফিরে এসে যখন রাত্রির সাথে কথা বলি তখন খুউব ভাল লাগে।

এখনো প্রায়ই রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার ‘রাত্রি’ কে খুঁজতে চেষ্টা করি। হয়তো বলবেন এখন আমি অনেক সুখী, তাই না?

কিন্তু না, এই সুখ আমার কপালে বেশিদিন সইলো না…

কোরিয়া আসার ঠিক দুই বছর পর আমার মোবাইলে একটি কল আসলো অপিচিত নাম্বার থেকে।
লোকটি জানালো আমার বউ অন্য আরেক জনের সাথে প্রেম করে। ব্যাপারটা একদম বিশ্বাস করিনি তখন। কেন করব বলেন? যখন আমার দূর্দিন গেছে তখন কিছু হলোনা, এখন এই সুদিনে বউ আমাকে ছেড়ে কেন অন্যের সাথে প্রেম করতে যাবে? হাজার হলেও তো আমাদের একটি ফুটফুটে বাচ্চা আছে। মেয়েরা কী এরকম গোছানো সংসার ভেঙ্গে তছনছ করতে পারে? শুনেছেন কখনও…?

কিন্তু ভাই, এ জগতে মানুষ সব পারে।

প্রতিদিনের মত আজ রাতেও কল করেছি বাংলাদেশে, বউয়ের মোবাইল বন্ধ। কিছুটা সন্দেহ হলো, ঘটনা কি? শ্বশুর বাড়ীর সবার কাছেই এক এক করে কল করলাম কিন্তু কেউ আমার কল ধরছেনা!
আমি আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম…

j0250432[1]

পরে শুনি আমার বউ তার খালাতো ভায়ের সাথে উধাও। আমার সব টাকা-পয়সা নিয়ে সে এখন হাওয়া। আমার কলিজার টুকরা ‘রাত্রি’কে ফেলে রেখে সে এখন নতুন সংসার পেতেছে।
নতুন স্বামীকে নিয়ে প্রেমের জোয়ারে ভাসছে, হয়তো সে সুখেই আছে…।

…কিন্তু আমার?

আমার চিন্তায় মা অসুস্থ্।
নাওয়া খাওয়া প্রায় বন্ধ। মা বলেন দেশে ফিরে আয়। কিন্তু কী করব ভেবে পাইনা। মাঝে মাঝে মনে হয় আত্নহত্যা করি কিন্তু ‘রাত্রি’র কথা ভেবে আর পারিনা। আমি মরে গেলে রাত্রি কোথায় দাঁড়াবে?
আমাকে বাঁচতেই হবে অন্ততঃ আমার মায়ের জন্য। রাত্রি আর মা ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ রইলো না আমার।

এখন আমার হাতে অনেক টাকা কিন্তু মনে সুখ নাই। জীবনে সুখের জন্য টাকার দরকার আছে। আবার টাকা থাকলেই যে সুখ আসবে তাও ঠিক নয়। সুখ অনেকটা ভাগ্যও বলতে পারেন। সবার কপালে সয় না। এই যে দেখেন আমার হাতে এখন অনেক টাকা কিন্তু সুখ নাই, এই টাকা দিয়ে আমি কী করব, বলেন?

যাই হোক ভাই, অনেক কিছু বলে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না। একটা প্রশ্ন করি?

আমি বললাম-হ্যাঁ বলেন।

‘আচ্ছা ভাই, আপনারা যারা এই কোরিয়াতে স্টুডেন্ট হিসেবে এসেছেন, তারা আমাদেরকে অশিক্ষিত মনে করেন কেন ভাই? আমরা ইপিএসে কাজ করতে আসছি বলে তো অশিক্ষিত না! অনেক ছাত্র ভায়েরা আমাদের সাথে কথা পর্যন্ত বলতে চায় না। কেমন জানি এভোয়েড করে চলেন, এটা কী ঠিক?’

আমি কী বলব ভেবে পাচ্ছিনা। লজ্জায় মাথা ঝিম ঝিম করছে।
কিছুক্ষন চিন্তা করে বললাম-‘সরি ভাই। কেউ যদি আপনার সাথে এ রকম দূর্ব্যবহার করে থাকেন তাহলে তার হয়ে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি’।

তারপর সেখান থেকে ফিরে এসে গভীর রাতে আকাশ পানে চেয়ে দেখলাম।
রাত্রির আকাশে অনেক কষ্ট। রাত্রির সেই কষ্ট কখনো কান পেতে শোনার চেষ্টা করিনা আমরা।

লেখকঃ কনকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক (গল্পটি বাংলাদেশী স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন ইন কোরিয়া’র পঞ্চম ই-বুকে প্রকাশিত হয়েছে)