cosmetics-ad

ভারতের কানপুরে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত শতাধিক

base_1479669195-cfgyj

ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরের কাছে এক ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১০০ ছাড়িয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ১২০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে সেখানকার পুলিশ। কানপুরের পাক্রায়ন এলাকায় গতকাল ভোরে ১৪টি বগিসহ পাটনা-ইন্দোর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছেন আরো প্রায় ২০০ জন। এদের অনেকের অবস্থাই গুরুতর। হতাহতের এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজের জন্য দুর্ঘটনাস্থলে ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স পাঠিয়েছে ভারত সরকার। খবর এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও বিবিসি।

কানপুর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে পাক্রায়ন এলাকার কাছে গতকাল রাত সাড়ে ৩টার দিকে এ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় অধিকাংশ যাত্রীই ঘুমাচ্ছিলেন। ট্রেনটির বগিগুলো দুমড়েমুচড়ে একটি আরেকটির ওপর উঠে গেছে। দেশটির নর্দান সেন্ট্রাল রেলওয়ের মুখপাত্র বিজয় কুমার জানান, দুর্ঘটনার পর পরই সেখানে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও চিকিত্সকরা গেছেন। দ্রুততার সঙ্গে শুরু হয়েছে উদ্ধারকাজ। উদ্ধারকর্মীরা বিধ্বস্ত বগিগুলো কেটে যাত্রীদের উদ্ধার করছেন। তবে এখন পর্যন্ত দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উত্তর প্রদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিচালক দলজিত্ সিং চৌধুরী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। আহত অনেকের অবস্থাই গুরুতর। এটি ভয়াবহ একটি অবস্থা। বিধ্বস্ত বগিগুলোয় আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারের জন্য ভারী কাটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।’

বিধ্বস্ত ট্রেনটির ইঞ্জিনসংলগ্ন দুটি বগি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনাই ঘটেছে এ দুই বগিতে। সতীশ কুমার নামে এক যাত্রী জানান, ট্রেনটি স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। কিন্তু হঠাত্ করেই থেমে যায়। পরে আবার চালু হওয়ার পর পরই লাইনচ্যুত হয় ট্রেনটি।

কৃষ্ণ কেশব নামে আরেক যাত্রী বিবিসিকে বলেন, ‘রাত ৩টার দিকে একটা ঝাঁকুনিতে আমাদের ঘুম ভাঙে। অনেকগুলো বগিই তখন লাইনচ্যুত হয়েছে। সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। বেশ কয়েকটি মরদেহ ও গুরুতর আহত ব্যক্তিকে আমি দেখেছি। ইঞ্জিনের লাগোয়া দুটি বগিতেই হতাহত সবচেয়ে বেশি হয়েছে।’

এদিকে দ্রুততম সময়ে উদ্ধারকাজ সম্পন্নের উদ্দেশ্যে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের জেলা থেকে সহায়তা প্রেরণের আহ্বান জানিয়েছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। সব স্থানীয় হাসপাতালকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছে ৩০টি অ্যাম্বুলেন্স। আহত যাত্রীদের কাছাকাছি স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে একটি বিশেষ ট্রেনে করে তাদের পাটনায় নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ‘দুর্ঘটনাস্থলটি দিল্লি থেকে সাড়ে ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। এরই মধ্যে ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সকে (এনডিআরএফ) ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন সেনাসদস্যরাও। স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরাও সরকারি দলগুলোর সঙ্গে উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছেন।’

এদিকে ভয়াবহভাবে বিধ্বস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক রেল কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আমরা বগিগুলো কেটে আটকে পড়া জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা করছি। সব ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে উদ্ধারকাজে। কিন্তু ধাতব বগিগুলো কাটা অনেক কষ্টসাধ্য।’

দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘পাটনা-ইন্দোর এক্সপ্রেসের লাইনচ্যুতির ঘটনায় প্রাণহানির ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা। এ ভয়াবহ দুর্ঘটনায় যারা আহত হয়েছেন, তাদের জন্য আমি প্রার্থনা করি। রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।’ এরই মধ্যে রেলমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মোদি।

দুর্ঘটনার পর রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে এরই মধ্যে তদন্তকাজ শুরুর আদেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাকবলিতদের জন্য ক্ষতিপূরণের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ‘এ দুর্ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের বেঁচে যাওয়া এক যাত্রী বলেন, ‘আমি জীবিত ও নিরাপদ রয়েছি। যথেষ্ট ভাগ্যবান আমি। কিন্তু এটি ছিল মৃত্যুর কাছাকাছি এক অভিজ্ঞতা।’ বেঁচে যাওয়া আরেক যাত্রী ২০ বছর বয়সী রুবি গুপ্ত। আগামী ১ ডিসেম্বর তার বিয়ে হওয়ার কথা। বিয়ের সদাই করে বাবাসহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে ফিরছিলেন তিনি। রুবি গুপ্তের চোখে এখন বিয়ের কোনো স্বপ্ন নেই। তিনি তার বাবাকে খুঁজছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার বাবাকে খুঁজে পাচ্ছি না। সবখানে তাকে খুঁজেছি। আমার হাত ভেঙে গেছে, আমার বোনরাও আহত হয়েছে।’

এদিকে ইন্দোর থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটির যাত্রীদের পরিজনরা ভিড় জমিয়েছেন ইন্দোর স্টেশনে। তারা তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। হাতে করে বিভিন্ন ছবি নিয়ে এসেছেন তারা।

প্রসঙ্গত, ভারতের রেল খাত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম। প্রতি দিন দুই কোটিরও বেশি যাত্রী পরিবহনে সক্ষম হলেও এর নিরাপত্তা মান এখনো মানসম্মত নয়। প্রতি বছর দেশটিতে রেল দুর্ঘটনায় অন্তত এক হাজার মানুষ মারা যায়।