cosmetics-ad

চাঁদাবাজিতে সহযোগিতা করেছেন কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক তার ঘনিষ্ট বলে আলোচিত হওয়া ছোয়ে সুন সিলকে চাঁদাবাজিতে সহায়তা করেছেন। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে ছোয়ে সুন সিল ভয়ভীতি দেখিয়ে ও প্রভাব খাটিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো থেকে ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার (৭ হাজার ৭৪০ কোটি উওন) চাঁদা আদায় করেছেন। দক্ষিণ কোরীয় কৌঁসুলিরা গতকাল এ কথা জানিয়েছেন। খবর ইয়নহাপ ও কোরিয়া টাইমস।

সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটরস অফিস গতকাল প্রেসিডেন্ট পার্কের বান্ধবীর অনৈতিক প্রভাব খাটানোকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটরস অফিসের প্রধান লি ইয়ুং রিয়ল বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হে’র বান্ধবী ছোয়ে সুন সিল সে দেশের ৫৩টি কোম্পানি থেকে চাঁদা আদায় করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার ১৯টি কনগ্লোমারেট এসব কোম্পানির মালিক।

দেশটির শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির কোনোটিই ছোয়ে সুন সিলের লিপসা থেকে রেহাই পায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম রিটেইলার লোটে, গাড়ি প্রস্তুতকারক হুন্দাই, ইস্পাত কোম্পানি পসকো, টেলিকম জায়ান্ট কেটি, ইলেকট্রনিকস পণ্য নির্মাতা স্যামসাংসহ সবকটি কোম্পানি ছোয়ে সুন সিলকে চাঁদা ও ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা দিতে বাধ্য হয়েছে।

pyh2016112115370034100_p2
সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটরস অফিসের প্রধান লি ইয়ুং রিয়ল

গতকাল সিউলে এক সংবাদ সম্মেলনে লি ইয়ুং রিয়ল বলেন, ছোয়ে সুন সিল তার নিয়ন্ত্রণাধীন দুটি ফাউন্ডেশনের জন্য এ চাঁদা আদায় করেছেন। ফাউন্ডেশনের ব্যাংক হিসাব থেকে তিনি নিজের মালিকানাধীন কোম্পানির হিসাবে অর্থ স্থানান্তরেরও চেষ্টা করেছেন। প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হে’র পাশাপাশি তার দুই সাবেক সহযোগী ছোয়ে সুন সিলকে চাঁদাবাজিতে সহায়তা করেছেন বলে লি ইয়ুং রিয়ল জানিয়েছেন।

ছোয়ে সুন সিল এক দফায় সবচেয়ে বড় অংকের চাঁদা আদায় করেছেন স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের কাছ থেকে। নিজের ফাউন্ডেশনের জন্য তিনি স্যামসাং থেকে ২০ কোটি ৪০ লাখ ডলার চাঁদা নিয়েছেন। এছাড়া ছোয়ে সুন সিলের কন্যার ঘোড়দৌড় প্রশিক্ষণের ব্যয় মেটাতে স্যামসাং পৃথকভাবে ৩০ লাখ ডলার চাঁদা দিয়েছে। জার্মানিতে ছোয়ে সুন সিল ও তার কন্যা চুং ইয়ু রার মালিকানাধীন একটি কোম্পানিতে ‘পরামর্শ ফি’র নামে স্যামসাং এ অর্থ পাঠায়।

ছোয়ে সুন সিলের বিরুদ্ধে রোববার রাষ্ট্রীয় বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার অপব্যবহার, জবরদস্তি, চাঁদা আদায়, কনগ্লোমারেটগুলোকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রতারণা চেষ্টার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের সহযোগী ও সাবেক সিনিয়র সেক্রেটারি ফর পলিসি কো-অর্ডিনেশন আন চং বামের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের আরেক সহযোগী ও সাবেক সিনিয়র সেক্রেটারি ফর প্রাইভেট প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাফেয়ার্স জিয়ং হো সুংয়ের বিরুদ্ধেও চই সুন-সিলের কাছে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নথি হস্তান্তরের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

park-and-choi২০১৩ সালের জানুয়ারিতে পার্ক গুন হে’র প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জিয়ং হো সুং ছোয়ে সুন সিলের কাছে মোট ১৮০টি সরকারি নথি হস্তান্তর করেন। এর মধ্যে ৪৭টি অতি গোপনীয় নথি ছিল বলে কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন। জিয়ং হো সুং প্রেসিডেন্টের বক্তৃতা, ক্যাবিনেট ও চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে তার বৈঠকের নোট ও এজেন্ডা, বিদেশ সফরের সময়সূচি, মন্ত্রিসভায় রদবদল পরিকল্পনা, কূটনৈতিক ইস্যুতে রক্ষিত নোট ও এজেন্ডাসহ বিভিন্ন নথি ই-মেইল, ফ্যাক্স ও কুরিয়ারের মাধ্যমে ছোয়ে সুন সিলের কাছে স্থানান্তর করেছেন।

ছোয়ে সুন সিল, আন চং-বাম ও জিয়ং হো সুং বর্তমানে হাজতে রয়েছেন। তিনজনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অভিযোগে সন্দেহভাজন হিসেবে প্রেসিডেন্ট পার্কের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘প্রেসিডেন্ট পার্কের যোগসাজশে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।’ তদন্তকারী দলের ঊর্ধ্বতন কৌঁসুলি রোহ সুং কিউন এ কথা জানিয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধানে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে বিচার থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ক্ষমতা থেকে বিদায়ের পর প্রেসিডেন্ট পার্কের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে বলে কৌঁসুলিরা আভাস দিয়েছেন। সিউলের প্রধান কৌঁসুলি লি ইয়ুং রিয়ল বলেছেন, ‘‘ঘটনার তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে প্রেসিডেন্ট পার্ক এ অপরাধে বড় ধরনের সহযোগিতা করেছেন। সাংবিধানিক অব্যাহতির কারণে আমরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করতে পারছি না। তবে তার বিষয়ে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।’’

সরকারি কৌঁসুলিদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের আইনজীবী পরবর্তীতে এ বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন।

ছোয়ে সুন সিলের কেলেঙ্কারির জের ধরে প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হে’র পদত্যাগ দাবিতে কোরীয় নাগরিকদের আন্দোলন জোরালো হয়ে উঠেছে। সিউলসহ কোরিয়ার বড় শহরগুলোয় প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ ও বিচার দাবিতে চার সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ হচ্ছে। শনিবার রাতে সিউলে ছয় লাখের বেশি বিক্ষোভকারী মোমবাতি মিছিলে অংশ নিয়েছেন। তারা অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট পার্কের পদত্যাগ ও গ্রেফতার দাবি করেন। এর আগে গতকাল ১০ লাখের বেশি মানুষ একই দাবিতে সিউলে বিক্ষোভে অংশ নেয় বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। গ্যালাপ কোরিয়ার জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট পার্কের গ্রহণযোগ্যতা ৫ শতাংশে ঠেকেছে।