cosmetics-ad

দেশে বিস্কুটের বাজার ৫ হাজার কোটি টাকার

base_1480827122-untitled-1

দেশের উদীয়মান ও দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পের মধ্যে অন্যতম বিস্কুট শিল্প। বর্তমানে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের বিস্কুট। এখন পর্যন্ত মাঝারি ও বড় মিলিয়ে এ খাতে শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। গত পাঁচ বছরে গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এ শিল্পের বাজার বর্তমান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মাথাপিছু বিস্কুট গ্রহণের হার কম হওয়ায় এ খাতে বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে। প্রচলিত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছে মানুষ। বিশেষত শহরাঞ্চলে এ প্রবণতা বেশি। আর এক্ষেত্রে মানুষের পছন্দের তালিকায় অন্যতম উপাদান হিসেবে উঠে আসছে বিস্কুট। ক্রমবর্ধমান এ চাহিদার বিপরীতে বিকশিত হচ্ছে দেশের বিস্কুট শিল্পও। এরই মধ্যে এ শিল্পের বাজার ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশে অটো ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএবিবিএমএ) সভাপতি মো. সফিকুর রহমান ভুঁইয়া এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রচলিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাংলাদেশে মাথাপিছু বিস্কুট গ্রহণের হার কম। তবে এক্ষেত্রে সম্প্রতি কিছু পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে এ শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় হারে বাড়ছে। ছোট ছোট ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠান ও বেকারিতে উত্পাদিত বিস্কুট ছাড়াও এ খাতে বার্ষিক টার্নওভার ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় গ্রুপও খাতটিতে বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে এসেছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ খাতের বাজার দ্বিগুণ হবে বলে আশা করি।

এদিকে বিস্কুট শিল্প ক্রমবিকাশমান একটি খাত হলেও মাথাপিছু বিস্কুট গ্রহণের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। ফলে উন্নত বিশ্ব, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এ শিল্পের প্রবৃদ্ধি কম। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ভিয়েতনামে গত পাঁচ বছরে বিস্কুট শিল্পে গড়ে ১০ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় বাংলাদেশে বিস্কুট শিল্পের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম।

শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে গবেষণাকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইবিআইএস ওয়ার্ল্ডের তথ্যমতে, ২০১০-১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিস্কুট শিল্পের বৈশ্বিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ১ শতাংশ হারে। আর ভারতে গত পাঁচ বছরে ১০-১২, পাকিস্তানে ১২-১৪ ও শ্রীলংকায় ১২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়। অথচ বাংলাদেশে একই সময়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ শতাংশ।

রিপোর্টের তথ্যানুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় মাথাপিছু বিস্কুট গ্রহণে সবচেয়ে এগিয়ে শ্রীলংকা, আর তলানিতে বাংলাদেশ। শ্রীলংকায় মাথাপিছু বার্ষিক বিস্কুট গ্রহণের হার চার কেজি। বিপরীতে বাংলাদেশে এ হার ১ দশমিক ৮০ কেজি। বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারতও। দেশটিতে মাথাপিছু বিস্কুট গ্রহণের হার ২ দশমিক ২ কেজি, পাকিস্তানে ২ দশমিক ৫০ কেজি ও জাপানে পাঁচ কেজি। তবে বাংলাদেশে মাথাপিছু বিস্কুট গ্রহণের এ নিম্নহারকেই সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের পাশাপাশি বাড়ছে মানুষের দৈনন্দিন ব্যস্ততাও। এ কারণে মানুষের কাছে প্রক্রিয়াজাত খাবারের আবেদন বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে আগামী পাঁচ বছরে দেশের মানুষের মধ্যে বিস্কুট গ্রহণের হার দ্বিগুণে উন্নীত হতে পারে, যা নিশ্চিতভাবে খাতটির বিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে।

দেশে বিস্কুট শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিএবিবিএমএ জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে দ্রুতই বেড়েছে দেশের বিস্কুট খাত। বর্তমানে দেশে ছোট-মাঝারি ও বড় মিলিয়ে পাঁচ হাজারের বেশি বিস্কুট উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠা হয়েছে গত পাঁচ বছরের মধ্যে। এছাড়া ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনাকারী আগের অনেক প্রতিষ্ঠানই এ সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে বলেও জানায় সংগঠনটি।

বিএবিবিএমএর তথ্যমতে, এ খাতে দেশে বৃহত্ পরিসরে ব্যবসা পরিচালনাকারী শতাধিক কোম্পানির বার্ষিক উত্পাদন ৪ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ বাজার অংশীদারিত্ব নিয়ে নেতৃত্বে রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। আর ৮ শতাংশ বাজার অংশীদারিত্ব নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আল আমিন ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ইন্ডাস্ট্রিজ। এছাড়া ৫ শতাংশ করে অংশীদারিত্ব নিয়ে হক, নাবিস্কো ও ড্যানিশ রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। এর পরের অবস্থানে থাকা বঙ্গজ, প্রাণ, রহমানিয়া, ডেকো, গ্লোব, ফু-ওয়াং, বনফুল, কিশোয়ান, থাই ফুড, বেঙ্গল, মাশাফি ও নিউ অলিস্পিয়ার আওতায় রয়েছে বাজারের ২-৩ শতাংশ শেয়ার। এছাড়া কোকোলা, পিনাকল, কাকলী, শিফা ইন্ডাস্ট্রিসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান বাজারের উল্লেখযোগ্য স্থান দখলে রেখেছে। এর বাইরে বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে দেশের দুই বড় শিল্পগ্রুপ কোহিনূর কেমিক্যালস ও বসুন্ধরা গ্রুপ। কারখানা স্থাপনের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন করা কোহিনূর কেমিক্যালস শিগগিরই তাদের রিদিশা ব্র্যান্ড নিয়ে বাজারে আসবে। অন্যদিকে বসুন্ধরা গ্রুপ রয়েছে বাজার গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে।

অলিম্পিকের সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশের বিস্কুট খাতের চেয়েও অনেক বেশি প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। সর্বশেষ হিসাব বছরেও আগের বছরের তুলনায় উত্পাদনে প্রায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে কোম্পানিটি। ২০১১-১৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে কোম্পানির বিস্কুট উত্পাদন বেড়েছে ১৬২ শতাংশ। ২০১১ সালে কোম্পানির বিস্কুটের উত্পাদন ছিল ৩০ হাজার ৫৪৮ টন, যা ২০১৬ সালে ৮০ হাজার ১৫৬ টনে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ের ব্যবধানে অলিম্পিকের নিট টার্নওভার ১৮২ শতাংশ ও নিট মুনাফা প্রায় ৫৩৩ গুণ বেড়েছে। ২০১১ সালে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের টার্নওভার ছিল ৩৮৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা, ২০১৬ সালে যা ১ হাজার ৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ২০১৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানির কর-পরবর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬২ কোটি ৩৭ লাখ টাকায়। পাঁচ বছর আগে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ২৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। মূলত এ সময়ে টিপ, এনার্জি প্লাস ও নাটি নামক তিনটি ভিন্ন স্বাদের বিস্কুট বাজারজাতের মাধ্যমে ব্যবসায় বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। একইভাবে অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানও খাতটিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি উত্পাদিত পণ্যে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে।

এ প্রসঙ্গে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ জনবহুল দেশ হওয়ায় এখানে খাবারের চাহিদা সবসময়ই বাড়বে। আগে মানুষ বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বিস্কুট বেশি খেত। দেশেই অলিম্পক ভালো মানের বিস্কুট উত্পাদন করায় আমদানি নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। ভিন্ন স্বাদ ও গুণগত মান ভালো থাকায় মানুষের মধ্যে দেশীয় বিস্কুটের চাহিদা বেড়েছে। বণিকবার্তা।