cosmetics-ad

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সংগ্রাম করছে দক্ষিণ কোরিয়া

base_1480424040-park

গত এক মাসে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে চাঙ্গাভাব দেখা গেলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় চিত্র ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। দেশটির পুঁজিবাজারের এ বিপরীত যাত্রার নেপথ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট পার্ক গুন হের দুর্নীতি-সংশ্লিষ্ট বিতর্ক। রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন দেশটির করপোরেট জগেক আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। প্রেসিডেন্টকে অভিশংসিত করার প্রশ্নে দেশটির পার্লামেন্টে আজ ভোটগ্রহণ হবে। বিষয়টি সামনে রেখে বিনিয়োগকারীরা কয়েক দিন ধরে বেশ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সিউলকে তাই রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। খবর নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ।

৮ নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের শেয়ারবাজার উঠতির দিকে রয়েছে। তবে এর বিপরীত অবস্থা ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায়। গত ২৪ অক্টোবর থেকে শুক্রবার পর্যন্ত দেশটির শেয়ারবাজারের সূচক কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ। শুধু পুঁজিবাজারই নয়, দেশটির কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠানগুলোও বেশ সংকটের মধ্যে রয়েছে। বহুমুখী পণ্য উত্পাদনকারী এসব কোম্পানিই দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বান্ধবী ছোয়ে সুন সিলের চাঁদাবাজি কেলেঙ্কারিতে সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে শুধু পার্ক গুন হের নামই উঠে আসেনি, বরং দেশটির কনগ্লোমারেটগুলোও এর সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার দেশটির পার্লামেন্টে শীর্ষ করপোরেট স্বত্বাগুলোর অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ভর্ত্সনা করা হয়। আইনপ্রণেতাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিরা দাবি করেছেন, তারা ছোয়ে সুন সিলের দুটি ফাউন্ডেশনে অনুদান হিসেবে অর্থ দিয়েছেন, ঘুষ হিসেবে নয়।

ছোয়ে সুন সিল প্রতিষ্ঠিত মির ও কে-স্পোর্টস ফাউন্ডেশনে ২ হাজার কোটি উন (প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ ডলার) দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট স্যামসাং গ্রুপ। এ কারণে আইনপ্রণেতাদের সমালোচনার তীর প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান লি জে ইয়ংয়ের দিকেই বেশি ছিল। স্যামসায প্রধান বরাবরই দাবি করে আসছেন, অনুদানের বিনিময়ে তারা সরকারের কাছ থেকে কোনো বিশেষ ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেননি। তবে সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে লি জে ইয়ং ইঙ্গিত দিয়েছেন, ছোয়ে সুন-সিলের ফাউন্ডেশনগুলোয় অনুদান দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে তার প্রতিষ্ঠানের ওপর বারবার চাপ আসছিল। পার্লামেন্টকে তিনি জানান, স্যামসাংয়ের পক্ষ থেকে অনুদান দেয়ার বিষয়টি ‘স্বপ্রণোদিত’ ছিল না। লি বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য অনিবার্য পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।’

এ ব্যাপারে জিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান হুর চ্যাং সুর কণ্ঠেও লি জে ইয়ংয়ের বিবৃতির প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো প্রস্তাব আসে, তবে তা এড়িয়ে যাওয়া বেশ কঠিন।’

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের হাতে অপরিসীম ক্ষমতা রয়েছে। তা কেবল প্রশাসনিক শীর্ষ পদেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভেটো দেয়ার মাধ্যমে যেকোনো আইন আটকে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে তার। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতাও তারই হাতে। কর্তৃত্বপূর্ণ নেতৃত্বের কিছু ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এটি নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে মসৃণ করে দেয়, ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যায়। তবে স্বচ্ছতার অভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতির জন্ম দেয়। এ কারণে দেশটির অনেক সাবেক প্রেসিডেন্টকে কেলেঙ্কারি ও সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, বিশেষ করে ক্ষমতা ছাড়ার পর।

পার্ক গুন হের কেলেঙ্কারির পর এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি নীতি কাঠামো পুনর্গঠন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় কিনা, সারা বিশ্বের নজর এখন সেদিকে। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে, তা হলো সংবিধানের সম্ভাব্য সংশোধন। প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা কিছু ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত করার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে দেশটির কয়েকজন আইনপ্রণেতা সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

এরই মধ্যে পার্ক গুন হে এপ্রিল নাগাদ ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে সম্মতির কথা জানিয়েছেন। স্থানীয় গণমাধ্যম ও কৌঁসুলিরা সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে দেশটির রাজনীতিতে নিজেদের আরো বেশি যুক্ত করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এক মাস আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদপত্র চোসুন ইলবোর প্রথম পাতায় একটি ছবি ছাপা হয়। প্রসিকিউটর অফিসের বাইরে থেকে গোপনে তোলা এ ছবিতে পার্ক গুন হের সাবেক সিনিয়র সেক্রেটারি উ বিয়ুং-উকে বেশ নিরুদ্বেগ থাকতে দেখা যায়। অথচ তাকে প্রসিকিউটর অফিসে ডাকা হয়েছিল ছোয়ে সুন সিলের চাঁদাবাজিতে সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তিনি দু’হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় তার সামনে দাঁড়ানো প্রসিকিউটরদেরও বেশ হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।

ছবিটি প্রকাশের পর পরই গণমাধ্যম বিষয়টির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া শুরু করে। এর পর দক্ষিণ কোরিয়ায় চলমান গণবিক্ষোভ আরো জোরদার হয়। সিউলে বিনিয়োগ কোম্পানি পরিচালনাকারী একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘এটি আসলেই হতবাক করে দেয়ার মতো একটি ঘটনা। ছবিটি মানুষের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। জনগণ চায়, কৌঁসুলিরা আরো নিরপেক্ষভাবে ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চালান। এটি কৌঁসুলিদের মনোভাব বদলে দিয়েছে, যা ইতিবাচক ঘটনা।’

তবে শুধু নিরপেক্ষ তদন্ত বা সংবিধান সংশোধন করলেই চলবে না। ভবিষ্যতে যেন দুর্নীতির ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয় এবং বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য সিউলকে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।