উল্টোপথের বিএমডব্লিউ এবং একজন ‘শিক্ষকের’ গল্প

বেতন বৈষম্য দূর করা এবং এমপিওভূক্তির দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষকদের আন্দোলনের মধ্যেই একটা খবর বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। তা হলো, উল্টো পথে বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ গাড়ি চালিয়ে পুলিশের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে বেসরকারি ঢাকা বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ এস এ মালেক এখন কারাগারে।

খবরে বলা হচ্ছে, গত ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর নিমতলি এলাকায় উল্টোপথে যাচ্ছিলো একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি। সেটি আটক করেন সার্জেন্ট মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ। কিন্তু এতে ক্ষেপে যান ‘শিক্ষক’ এস এ মালেক। শিক্ষক শব্দটিকে বন্ধনীর ভেতরে রাখছি এ কারণে যে, তিনি যে ভাষায় এবং যে ভঙ্গিতে ওই পুলিশ কর্মকর্তার সাথে আচরণ করেছেন, তা কোনোভাবেই শিক্ষকসুলভ নয়। তার উত্তেজিত চেহারা এবং কথাবার্তা এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে। বরং পুলিশ কর্মকর্তাই তাকে বারবার সংযত হয়ে কথা বলার অনুরোধ করছিলেন। কিন্তু ‘শিক্ষক’ মহোদয় সংযত তো হনইনি, বরং তিনি সার্জেন্টের ওপর চড়াও হন এবং গাড়ির জব্দ করা কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে চলে যান। শাহবাগ থানা পুলিশ অবশ্য পরে হাইকোর্ট এলাকা থেকে গাড়িটি আটক করে। ওইদিনই পুলিশের ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে এস এ মালেকের বিরুদ্ধে মামলা করেন সার্জেন্ট মহিবুল্লাহ। এই মামলায় আদালত তাকে কারাগারে পাঠান।

প্রশ্ন এখানে কয়েকটি:

একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ কোটি টাকা দামের বিএমডব্লিউ কিনলেন কীভাবে? কত টাকা বেতন পান তিনি? বিলাসবহুল এই গাড়ি যদি ট্যাক্স দিয়ে আনতে হয়, তাহলে এর দাম পড়ে কয়েক কোটি টাকা। সংসদ সদস্যরা করমুক্ত সুবিধায় আনতে পারেন। গাড়িটি কি কর দিয়ে না করমুক্ত সুবিধায় আনা হয়েছে, সে বিষয়ে অনুসন্ধান জরুরি।

আমার বাবাও একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। ৪০ বছর অধ্যাপনার পরও তিনি এখনও ছোট্ট মফস্বল শহরে যেখানে থাকেন, সেটি ভাড়া বাসা। তিন রুমের একটি বাড়িও নির্মাণ করতে পারেননি। তাই যখন দেখলাম একজন অধ্যক্ষ বিএমডব্লিউ গাড়ি চালাচ্ছেন এবং উল্টোপথে যাওয়ায় পুলিশের হাতে আটকের পর উল্টো তিনিই পুলিশকে শাসাচ্ছেন––তখন খুব বিস্মিত হই এবং শিক্ষকপিতার সন্তান হিসেবে লজ্জিতবোধ করি।

ধরে নিচ্ছি ওই অধ্যক্ষ পারিবারিকভাবে বা অন্য যেকোনোভাবেই সম্পদশালী এবং বিএমডব্লিউ কেনার সক্ষমতা আছে। কিন্তু তিনি যদি উল্টো পথে গাড়ি চালান, তাহলে তার শিক্ষার্থীরা রাস্তায় কী করবে? তারা কি মানুষের উপরে গাড়ি তুলে দেবে? ধরা যাক তার খুব তাড়া ছিল। দ্রুতই কোথাও যেতে হবে, তাই রং মেরেছেন। কিন্তু পুলিশ যখন আটকালো তখন তিনি যে আচরণ করলেন, তার কী ব্যাখ্যা আছে? পুলিশ যে তার সাথে খুব খারাপ আচরণ করেছে, ভিডিও তা বলে না। বরং কর্তব্যরত পুলিশকে যথেষ্ট সংযত মনে হয়েছে। কথিত ওই অধ্যক্ষ যে আচরণ করেছেন তাই বরং রাস্তার মাস্তানকেও হার মানায়।

আমরা এই স্বপ্ন দেখতেই পারি এবং প্রত্যাশাও করি যে, আমাদের যারা শিক্ষিত করেছেন, যাদের কাছে আমরা বর্ণমালা শিখেছি, বিদ্যা শিখেছি––তারা বিএমডব্লিউ চড়বেন বা সেই সক্ষমতা তাদের হবে। কিন্তু সেটি অবশ্যই বৈধ আয়ে। আমাদের শিক্ষকরা যে বেতন পান, তাতে সংসার চালানোর পর সিএনজি অটোরিকশা কেনাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বরং বেতনবৈষম্য বন্ধ এবং এমপিওভুক্তির দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষক এখন আন্দোলন করছেন, অনশন করছেন। ফলে এই শিক্ষকদের সঙ্গে আমরা কোনোভাবেই এস এ মালেকদের তুলনা করতে পারি না। শিক্ষক নামধারী আরও যেসব মানুষ প্রতিনিয়ত অজস্র অন্যায় আর অসদুপায় অবলম্বন করে পয়সা বানান, সেই লোকগুলোকে আমরা শিক্ষক বলতে পারি কি না, সে প্রশ্নও তোলা অন্যায় নয়।

পাল্টা যুক্তিও আছে। যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, প্রতিটি পেশার লোকই যেখানে কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতি ও অন্যায়ের সাথে যুক্ত, সেই সমাজে বা রাষ্ট্রে শিক্ষকরা কী করে স্রোতের বিপরীতে থাকবেন? তর্কের খাতিরে হয়তো এ কথা ঠিক। কিন্তু তারপরও আমরা একজন রাজনীতিবিদ, একজন আমলা, একজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন ব্যাংকার কিংবা একজন ব্যবসায়ীকে যে চোখে দেখি––একজন শিক্ষককে সেভাবে দেখে অভ্যস্ত নই। শিক্ষকদের কাছ থেকে আমরা সর্বোচ্চ নীতি-নৈতিকতা আর মার্জিত আচরণ প্রত্যাশা করি। খবরটি যদি এমন দেখতাম যে, ওই অধ্যক্ষের সঙ্গে পুলিশ খারাপ আচরণ করেছে, সেটিই বরং আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতায় স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু দেশের মানুষ যা দেখলো, তা খুবই হতাশাজনক।

এটা ঠিক যে, একজন এস এ মালেক পুরো শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তার এই আচরণের দায় পুরো শিক্ষকসমাজ নেবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের অগোচরে আমাদের শিক্ষাদাতাদের মধ্যে এরকম অসংখ্য এস এ মালেক তৈরি হয়ে গেছেন। ভাগ্যচক্রে হয়তো ফেঁসে গেছেন এক এস এ মালেক।

লেখকঃ আমীন আল রশীদ

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাটেলিগ্রাফ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)