sentbe-top

চাকরি ছেড়ে স্বাধীন পেশায় ঝুঁকছে দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা

korea-youtuberস্যামসাং আর হুন্দাইয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে স্বাধীন পেশায় ঝুঁকছে দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা৷ করপোরেট চাকরির বাধ্যবাধকতা আর কাজের চাপে ইউটিউব ভিডিও তৈরি, এমনকি গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করাও বেছে নিচ্ছেন তাঁরা৷

স্যামসাংয়ের বাৎসরিক সাড়ে ৫৭ হাজার ডলারের চাকরি করতেন দক্ষিণ কোরিয়ার ৩২ বছর বয়সি ইউন চ্যাং-হিউন৷ দেশটির যে-কোনো পেশার শুরুর বেতনের চেয়ে এটি তিনগুণ বেশি৷ কিন্তু ২০১৫ সালে সেই চাকরি ছেড়ে দেন ইউন৷ চালু করেন নিজের ইউটিউব চ্যানেল৷ এমন সিদ্ধান্তে তাঁর মানসিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল পরিবারের সদস্যরাও৷

ইউন বলছেন, ক্রমাগত রাত্রিকালীন দায়িত্ব, সীমিত পদোন্নতি আর আবাসন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোভনীয় এই চাকরির মায়া তাঁকে ত্যাগ করতে হয়েছে৷ ‍‘‘যখন চাকরি ছাড়লাম, আমাকে বলা হয়েছিল, আমি পাগল হয়ে গেলাম কিনা৷ তবে আমি যদি পুনরায় চাকরিতে ফিরে যেতাম, তাহলে আবার ছাড়তাম, কারণ আমার বসরাও সুখী ছিলেন না৷ অতিমাত্রায় কাজ আর একাকিত্বের মধ্যে ছিলেন তাঁরা,” রয়টার্সকে বলেন তিনি৷ ইউটিউব চ্যানেল দিয়েই এখন স্বাধীন জীবন নির্বাহ করছেন ইউন৷

স্যামসাং ও হুন্দাইয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠান ১৯৫০ দশকের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দক্ষিণ কোরিয়াকে এক যুগেরও কম সময়ে এশিয়ার চতুর্থ শীর্ষ অর্থনীতির দেশে পরিণত করেছে৷ মধ্যবিত্তের জন্য বড় বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান৷

কিন্তু অর্থনীতির ধীর গতি এবং ছোট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্থানের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা যুবকদেরকে এখন আর বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তেমন একটা টানতে পারছে না৷ সরকার পরিচালিত ‘কোরিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেইনিং’এর গবেষক ব্যান গা-উন বলছেন, এমন প্রবণতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের যুবকদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ যদিও কঠোর করপোরেট সংস্কৃতি এবং একই রকম দক্ষতার স্নাতক বেশি পাওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ায় এই সমস্যা বাড়ছে৷

২০১২ সালে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় গড় চাকরির মেয়াদ সবচেয়ে কম – যা সদস্য দেশগুলোর গড় ৯ দশমিক ৪ বছরের বিপরীতে সেদেশে ৬ দশমিক ৬ বছর৷ সেখানে চাকরিতে অসন্তুষ্টির হার ৫৫ শতাংশ, যা অন্য সবার চেয়ে বেশি বলেও উঠে এসেছে ওই গবেষণায়৷

‘চাকরি ছাড়া’ দক্ষিণ কোরীয়দের প্রথম ১০টি নিউ ইয়ার রেজুলেশনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে৷ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে চাকরি ছাড়ার পদ্ধতি শিখতে পড়াশোনাও করছেন অনেক দক্ষিণ কোরীয়৷ তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান ‘স্কুল অব কুইটিং জবস’৷ এর প্রতিষ্ঠাতা জ্যাং সু-হান রয়টার্সকে জানান, দক্ষিণ সৌলে মাত্র তিনটি শ্রেণিকক্ষের প্রতিষ্ঠান তাদের৷ ২০১৬ সালে চালুর পর থেকে তাতে সাত হাজার জন অংশ নিয়েছেন৷

৩৪ বছর বয়সি জ্যাং স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের চাকরি ছেড়ে এই প্রতিষ্ঠান দিয়েছেন৷ সেখানে তিনি ইউটিউব চ্যানেল চালানো, পরিচয় সংকট মেটানো এবং প্ল্যান বি-সহ প্রায় ৫০টি কোর্স পরিচালান করছেন৷

২০১৯ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, চাকরি ছাড়ার এমন প্রবণতার মধ্যেও দক্ষিণ কোরিয়ায় কাঙ্খিত চাকরির ক্ষেত্রে শীর্ষেই রয়েছে স্যামসাং৷ সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের চাকরির মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ইউটিউবার হওয়া৷ এর আগে রয়েছে খেলোয়াড়, স্কুল শিক্ষক, চিকিৎসক ও শেফ৷

এসবের পাশাপাশি এমনকি কৃষিতেও অনেকে ঝুঁকছেন বলে গত বছরের এক জরিপে উঠে এসেছে৷ ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কৃষির জন্য ১২ হাজার মানুষ শহর ছেড়েছেন, যা আগের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেড়েছে৷

গত বছর সরকারি ভর্তুকির সহায়তা নিয়ে ৫ হাজার ৮০০ দক্ষিণ কোরীয় চাকরির জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যা ২০১৩ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ৷ হুন্দাইয়ের চাকরি ছেড়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার পথ ধরেন প্ল্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার চো সেউঙ-ডাক৷

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‍‘‘আমি মনে করি আমার ছেলে দক্ষিণ কোরিয়ায় আমার মতো চাকরি পাবে না৷ আমি প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে পরিচ্ছন্নতার কাজ করব, সেটাও ভালো৷”

সৌজন্যে- ডয়েচে ভেলে

sentbe-top