cosmetics-ad

হাসপাতালে বকেয়া ১৯ লাখ, দেশে ফিরতে পারছেন না ব্রুনাই প্রবাসী দুই বাংলাদেশি

brunai

হাসপাতালের বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় ব্রুনাই থেকে দেশে ফিরতে পারছেন না দুই বাংলাদেশী। সংসারে সুখ আনতে ব্রুনাই দারুসসালামে গিয়ে রাজু সরদার ও এনামুল হক নামের দুই বাংলাদেশী ভাগ্য বিড়ম্বনায় ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালে। প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বিদেশ গিয়ে প্রথমে দালালদের প্রতারণার শিকার হন তারা।

এরপর রাজু দোতলা থেকে পড়ে ২ মাস এবং এনামুল হক ব্রেইন স্ট্রোক করে ৭ মাস ধরে সেদেশের হাসপাতালের বিছানায় আছেন। দীর্ঘ চিকিৎসায় তারা এখন মোটামুটি সুস্থ হলেও চিকিৎসা বাবদ প্রায় ১৯ লাখ টাকা বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় হাসপাতাল ছাড়তে পাচ্ছেন না। প্রতিদিনই বাড়ছে তাদের চিকিৎসা ব্যয়। দীর্ঘ হচ্ছে দেশে ফেরার অপেক্ষা।

ব্রুনাই দারুসসালামে বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) জিলাল হোসেন জানান, তাদের কারোরই ইন্সুরেন্স নেই। এর মধ্যে রাজু নামের ব্যক্তিটি চিহিৃত দালালচক্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এসেছেন। ব্ল্যাক লিস্টেডে কোম্পানিতে এসেছেন। তারা অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। হাইকমিশনের তো ওই রকম বড় ধরণের ব্যয় বহনের সুযোগ নেই। আমরা বাংলাদেশী কমিউনিটি থেকে টাকা উঠিয়ে ব্যয় মিটানোর চেষ্টা করছি।

রাজু সরদার (বিকিউ-০৭১৪৮০৮)নামের যুবকের বাড়ি খুলনার রুপসা থানার সামন্ত সেনা গ্রামে। বাবার নাম মো. আলীজান সরদার। ঢাকার একটি গার্মেন্টস এ ১৫ বছর চাকরি করেছেন। সর্বশেষ তিনি ২৫ হাজার টাকা বেতনে প্রডাকশন ইনচার্জ ছিলেন। ভালই চলছিল তার দিন। কিন্তু পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় নুরজামালের মাধ্যমে বাংলাদেশী দম্পতি আইয়ুব-আয়েশার মাধ্যমে ভাল বেতনের প্রতিশ্রুতিতে ব্রুনাই যান। আইয়ুব থাকেন মালয়েশিয়ায়। আয়েশা থাকেন ব্রুনাই।

ফোনে রাজু এই প্রতিবেদককে জানান, যে কোম্পানিতে গিয়ে ছিলেন ৬ মাসেও সেখানে কোনো কাজ দেয়া হয়নি। খেয়ে না খেয়ে ৬ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর পরিচিত কয়েকজন বাংলাদেশীর মাধ্যমে চাইনিজ একটি কোম্পানিতে কন্সট্রাকশনের কাজ পাই। সেই কাজ করা অবস্থায় দোতলা টিনের (ইন্ডাস্ট্রিয়াল) ঘরের চাল থেকে পড়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ব্রুনাই দারুসসালামের রিপাস হাসপাতালে ভর্তি হই। দুই হাত ও ডান পায়ের ক্ষত ভাল হলেও বাম পায়ের পাতার উপর ভেঙ্গে গেছে।
রাজু বলেন, চিকিৎসকরা ২০ দিন আগে বলেছেন তুমি চলে যাও। এটা হোটেল না যে দিনের পর দিন থাকা যাবে। হাসপাতালে প্রায় ২৫শ’ডলার বকেয়া পড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। আমার বসকে কয়েকবার ফোন দিয়েছি, হাসপাতাল থেকেও ফোন দিয়েছে কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। এখন কী করবো বুঝতে পারছি না।

তিনি আরো বলেন, যে কোম্পানিতে (সিরিসিং)এসেছি, সেখানে কোনো কাজ নাই। তারা শুধু ওই কোম্পানির নামে, ভিসা বের করে। এরপর তা বিক্রি করে। এরপর দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে লোক এনে রাস্তায় ছেড়ে দেয়।

ব্রুনাইন দারুসসালামের রিপাস হাসপাতালে দীর্ঘ ৭ মাস ধরে ভর্তি আছেন নওগাঁ জেলার সদর উপজেলার চকপ্রসাদ দক্ষিণপাড়া গ্রামের আব্দুস সাত্তার মন্ডলের ছেলে এনামুল হক। গত ১২ মার্চ ব্রেইন স্ট্রোক করে এই হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। জ্ঞান ফিরে পান গত ২৫ এপ্রিল। প্রথম দিকে কোম্পানি ও এজেন্টের লোকজন তাকে দেখতে গেলেও গত রমজান মাস থেকে কেউ আর যায় না বলে জানান তিনি। তিনি মোটামুটি সুস্থ হলেও চিকিৎসা বকেয়া বাবদ প্রায় ২০ হাজার ডলার, বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৭ লাখ টাকা পরিশোধ করতে না পারায় বের হতে পারছেন না।

এনামুল জানান, তিনি এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। ভাল বেতনের কথা বলে প্রায় ৪ লাখ টাকায় নওগাঁর মহাদেবপুর এলাকার রফিকুল ইসলাম নামের একজন তাকে ব্রুনাই পাঠায়। প্রতিশ্রুত বেতনে চাকরি তো পাননি। এরইমধ্যে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ভাগ্য বিড়ম্বনায় পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন তিনি হাসপাতালের বিছানায়। অন্যদিকে গ্রামে তার বাবা-মা, স্ত্রী-দুই কন্যা নিয়েও টেনশন তার। কারণ তার পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। ৭ মাস ধরে কোনো টাকা পাঠাতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ব্রুনাই দারুসসালামে রাজু ও এনামুলের মতো অনেকেই দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয় দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন। দালালচক্র এতোটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারাও হুমকীতে থাকেন।

ব্রুনাই দারুসসালামে বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) জিলাল হোসেন জানান, আজ (শনিবার)ব্রুনাই দারুসসালামের রিপাস হাসপাতালে ওই দুই বাংলাদেশীকে শ্রম উইংয়ের পক্ষ থেকে খোঁজ খবর নেয়া হয়েছে। তারা মোটামুটি সুস্থ। তবে হাসপাতালে বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া থাকায় তাদের রিলিজ করানো যাচ্ছে না। হাইকমিশন বা শ্রম উইংয়ের এতো পরিমাণ টাকা দেয়ার অবস্থা নেই। তাই আমরা ব্রুনাইতে যারা ভাল অবস্থানে আছেন তাদের দ্বারস্থ হচ্ছি। এ ব্যাপারে আমরা বাংলাদেশী কমিউনিটির সহযোগীতা চাই।