৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে গুটিকয় শিক্ষার্থীর ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে যে সমাবেশ শুরু, তা পরবর্তী এক মাসের মধ্যে আকারে ও প্রত্যয়ে সুবিশাল হয়ে ওঠে। পর্যায়ক্রমে এই আন্দোলন দেশের ওপর চেপে বসা শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তিতে গর্জে ওঠে।
চব্বিশের জুলাইয়ের অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের পর বছর ঘুরে আবার এসেছে জুলাই। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বিক্ষোভ, প্রতিরোধ ও জনবিস্ফোরণ যাবতীয় রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে দেয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরাচার পতনের এক দফা- পুরো জুলাই যাত্রা ছিল চরম উৎকণ্ঠা-আতঙ্ক আর দৃপ্ত সাহসের নাম, যেটির ইতি ঘটে ৫ আগস্ট। বাংলার আপামর ছাত্র-জনতার কাছে যে দিনটি ৩৬ জুলাই নামে পরিচিত।
আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা সমন্বয়করা বলছেন, জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হত্যার মধ্য দিয়ে কোটিবিরোধীর মতো অরাজনৈতিক একটি আন্দোলন রূপ নেয় রাজনৈতিক আন্দোলনে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত-মার্কিন-চীন ইত্যাদি পরাশক্তির ভূমিকা, আওয়ামী লীগ কর্মীদের যুদ্ধংদেহী হিংস্র আচরণ কিংবা পুলিশ বাহিনীর চূড়ান্ত নৃশংসতা– কোনো কিছুই ছাত্র-জনতার দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ থামিয়ে রাখতে পারেনি। খণ্ড খণ্ড মিছিলে প্রতিদিন যুক্ত হতে থাকে ক্ষুব্ধ, অত্যাচারিত মানুষের ঢল।
২০১৮ সালে সরকারে জারি করা সার্কুলারকে ২৪ সালের ৫ জুন অবৈধ ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। এরপরই ৫৬ শতাংশ কোটা বাতিলের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। ২৪ দিনের বিরতির পর ১ জুলাই কোটা বাতিলের নির্বাহী আদেশের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। ৫ জুলাই থেকে কর্মসূচি আসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে।
বলা চলে অহিংস একটি আন্দোলনকে বিক্ষুব্ধ করেন শেখ হাসিনার নিজেই। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে? এ কথা শুনেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। গতি বাড়ে আন্দোলনে। জুলাইয়ের একেকটি দিন ছিল রাতেরও চেয়ে অন্ধকার।

ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ। ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক চরিত্র পায় গোটা আন্দোলন। আন্দোলনের এ পর্যায়ে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় সব শ্রেণিপেশার মানুষ। বুলেট উপেক্ষা করে ঝাঁকে ঝাঁকে মুক্তিমুখীন জনতা নেমে আসেন রাজপথে। ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগে স্বৈরাচার মুক্ত হয় বাংলাদেশ। শুরু হয় নতুন ইতিহাস। ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে এক দফার ঘোষণা দেন নাহিদ ইসলাম।
স্বৈরাচারী সরকার নিজের দেশের মানুষের বুকেই নির্বিচারে গুলি ছোড়ে, অন্তত দেড় হাজার নিহত হন। চোখ-হাত-পাসহ নানা অঙ্গহানির শিকার হন আরও ২০ হাজার মানুষ। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা স্বৈরাচারের গুলিতে স্তব্ধ হয় না, এর প্রমাণ মেলে আরেকবার; যত গুলি ছোড়ে পুলিশ, মিছিলে মানুষ তত বাড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশকে পিছু হটতে হয়, মানুষের মিছিল সব কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকে। ৫ আগস্ট মহাপরাক্রমশালী শেখ হাসিনার সরকার তাসের ঘরের মতো লুটিয়ে পড়ে; তিনি সরকারি হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করেন। বিজয়ী মানুষের ঢল পৌঁছে যায় গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হান্নান মাসুদ বলছেন, ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শেখ হাসিনার পতন। ছাত্ররা বলেছিল, জুলাই মাসেই শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করবে তারা। ৩১ জুলাইয়ের পর থেকে তারা নতুনভাবে তারিখ গণনা শুরু করে; সেই হিসাবে ৫ অগাস্ট ছিল ‘৩৬ জুলাই’।

অন্যায় আর অবিচারকে বাংলার মানুষ যে অন্ততকাল ধরে মেনে নেয় না তারই জ্বলজ্বলে উদাহরণ ২০২৪- এর জুলাই। যে জুলাইয়ের ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভিত্তি নতুন করে নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশের হাল ধরেছেন। এখন দেখার বিষয় কতটুকু হাঁটতে পারে বাংলাদেশ।



































