শুক্রবার । মার্চ ১৩, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ১০ অক্টোবর ২০২৫, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

গুম ও নির্যাতনের মামলায় অভিযোগ দাখিলে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ


HRW

গুম, গোপনে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগে বাংলাদেশে ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলে সন্তোষ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা।

গতকাল (বৃহস্পতিবার) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরপরই সংস্থাটি এক প্রতিবেদনে প্রতিক্রিয়া জানায়। এতে বলা হয়, “বহু প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের পথে এটি একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি।”

‘ন্যায়বিচারের পথে এক ধাপ এগোল বাংলাদেশ’

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলির লেখা প্রতিবেদনটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে “ন্যায়বিচারের পথে এক ধাপ এগোল বাংলাদেশ”। প্রতিবেদনে বলা হয়, যদিও অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে ২০১৭ সালের একটি আগের রিপোর্টের উল্লেখ করে বলা হয়, তখন গুম ও গোপনে আটক রাখার অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জবাবে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সেটিকে “অপপ্রচার” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিরা আসলে পলাতক আসামি বা প্রতারক। কিন্তু বাস্তবে সেই সময় কোনো তদন্ত হয়নি।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি লেখেন, “তখনকার সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল তদন্তের, কিন্তু তা কখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি।”

‘২০০৯ থেকে ২০২৪- এক দশকেরও বেশি সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসন’

এইচআরডব্লিউ বলেছে, শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা আরও জোরদার হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও বাক্‌স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে সরকার সাধারণত অস্বীকার বা মিথ্যা আশ্বাসের আশ্রয় নিত।

প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এসব দমন–পীড়ন চলতে থাকে। টানা তিন সপ্তাহের গণঅভ্যুত্থান ও সহিংস বিক্ষোভে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন। এর পর শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং হাসিনা, আসাদুজ্জামানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা দেশত্যাগ করেন।

পরবর্তী সময়ে শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করতে “গুম তদন্ত কমিশন” গঠন করে। কমিশনে এখন পর্যন্ত প্রায় ১,৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’: গুম কমিশনের ভয়াবহ তথ্যচিত্র

সম্প্রতি কমিশন ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে নৃশংস নির্যাতনের বিবরণসহ বহু ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এই প্রতিবেদনের পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামানসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। দুটি মামলায় ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গৃহীত হয়েছে।

গুমের শিকার আইনজীবী আরমানের গল্প

আদালতে অভিযোগ ঘোষণা করার সময় উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান- যিনি নিজেই ছিলেন গুমের শিকার। ২০১৬ সালে নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি এইচআরডব্লিউকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। পরে তাঁকে একটি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন বন্দিশালায় আট বছর ধরে রাখা হয়। হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি মুক্তি পান।

‘এটি মানবাধিকারের জন্য এক আশাব্যঞ্জক মুহূর্ত’

প্রতিবেদনের শেষে মীনাক্ষী গাঙ্গুলি লেখেন, “মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমরা এমন মুহূর্তের জন্যই কাজ করি। এই অভিযোগ দাখিল ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এখনও বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটছে, আর মৃত্যুদণ্ডের মতো বিষয়গুলো গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়ে গেছে।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই বিচার প্রক্রিয়া গুম ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের জন্য বাংলাদেশে দায়বদ্ধতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।