
ফাইল ছবি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। তবে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান এবং সামরিক হামলা পুনরায় শুরুর ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শনিবার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি তেহরানে দুই দিনের সফরে যান। সফরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্ম বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেন। গালিবাফ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে একই সময়ে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
গত সপ্তাহে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, ইরান দাবি করেছে যে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিলেও ওয়াশিংটন পাকিস্তানের মাধ্যমে তাদের কাছে সংশোধিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এখনো চলছে। পরে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানায়, পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানোর জন্য ইরান ১৪ দফা প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সপ্তাহান্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাখ পারমানবিক কেন্দ্রের বাইরের অংশে ড্রোন হামলায় একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে আগুন লাগে। একই সময়ে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরাকের আকাশসীমা থেকে আসা তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
সোমবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারাকাহ হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
প্রস্তাব নিয়ে অচলাবস্থা
৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান একাধিক প্রস্তাব বিনিময় করেছে। ২৮ এপ্রিল ইরান ১৪ দফা পাল্টা প্রস্তাব দেয়। এতে ৩০ দিনের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, ইরানের সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, জব্দ সম্পদ ফেরত, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন ব্যবস্থার কথা বলা হয়। তবে পারমাণবিক ইস্যু এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো এবং নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলার দাবি জানায়।
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার নিয়ে তারা কোনো আপস করবে না। বাঘাই বলেন, ‘এটি এমন কোনো বিষয় নয় যা নিয়ে আলোচনা বা সমঝোতা করা হবে। এনপিটি অনুযায়ী ইরানের সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃত।’
এ ছাড়া নতুন আলোচনার জন্য ইরান পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। সেগুলো হলো—সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ মুক্ত করা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক Javad Heiran-Nia বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে পারমাণবিক আলোচনা আগে শুরু হোক যাতে তারা নৌ অবরোধকে চাপ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে ইরান প্রথমে হরমুজ ইস্যুর সমাধান চায়।
নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালির আশপাশে তাদের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিকে আবার সক্রিয় করেছে। একই সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ইরানের জ্বালানি ও অবকাঠামো স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে জানা গেছে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে আরও বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। দুর্ঘটনাবশত কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে নতুন সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
চীন সফরের পরও ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে কোনো বড় অগ্রগতি আনতে পারেননি। চীন বরং যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে মাঝেমধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে সীমিত সংঘাত দেখা দিতে পারে।
আল জাজিরা
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প












































