
ছবি: সংগৃহীত
হাতকড়া পরা অবস্থায় একের পর এক লাথি-ঘুষি, নির্বিচারে লাঠি আর পেপার স্প্রের যথেচ্ছ ব্যবহার, এমনকি নির্যাতনের ক্ষত লুকাতে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন জালিয়াতি—মালয়েশিয়ার তাইপিং কারাগারে বন্দিদের ওপর কারারক্ষীদের চালানো এমনই এক গা শিউরে ওঠা ও অমানবিক নির্যাতনের চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি ওই কারাগারে ঘটে যাওয়া দাঙ্গার ঘটনা তদন্তে নেমে দেশটির মানবাধিকার কমিশন ‘সুহাকাম’ তাদের গণতদন্ত প্রতিবেদনে এই ভয়াল চিত্র তুলে ধরেছে।
চাঞ্চল্যকর এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মালয়েশিয়ার কারা বিভাগ এটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে।
দেশটির জাতীয় সংবাদ সংস্থা বারনামা জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার কারা বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে—কারা ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগসহ সুহাকামের প্রতিবেদনের প্রতিটি সুপারিশ তারা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
বিভাগটি জানায়, তারা তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবে এবং প্রতিটি সুপারিশ গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে। বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা সম্পূর্ণ সততার সঙ্গে প্রতিবেদনটি পরীক্ষা করব, যেন উত্থাপিত প্রতিটি বিষয়ে যথাযথ মনোযোগ দেওয়া হয়। নিরাপত্তা, কল্যাণ, পুনর্বাসন এবং মানবাধিকার সংরক্ষণের প্রতি আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।” একইসঙ্গে, মূল তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কোনো ধরনের অনুমান বা অকাল সিদ্ধান্তে না যাওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশটির প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘নিউ স্ট্রেইটস টাইমস’ জানিয়েছে, গত ২৫ মে সুহাকামের গণতদন্ত প্যানেল তাইপিং কারাগার দাঙ্গার এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। সুহাকামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হিশামুদ্দিন এমডি ইউনুস স্পষ্ট ভাষায় জানান, কারাগারের সিনিয়র কর্মকর্তাদের গুরুতর অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে; যার নির্মম পরিণতি হিসেবে গান চিন এং নামে ৬১ বছর বয়সী এক বন্দির মৃত্যু ঘটে।
সংবাদমাধ্যম ‘মালেশিয়াকিনি’ ও ‘ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে’র প্রতিবেদনে এই নির্যাতনের আরও কিছু লোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে:
বর্বর নির্যাতন: হল ‘বি’ থেকে ব্লক ‘ই’-তে বন্দি স্থানান্তরের সময় বিপুলসংখ্যক কারারক্ষী বন্দিদের ওপর অতিরিক্ত শারীরিক নির্যাতন চালায়। হাতকড়া পরা বন্দিদের ওপর নির্বিচারে লাঠি ও পেপার স্প্রে ব্যবহার করায় অনেকের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং হাত-পা ভেঙে যায়।
চিকিৎসায় অবহেলা ও জালিয়াতি: গুরুতর আহত বন্দিদের চিকিৎসা সেবা দিতে ব্যর্থতার পাশাপাশি কিছু চিকিৎসাকর্মী কারারক্ষীদের বাঁচাতে বন্দিদের জখমকে ‘পড়ে যাওয়ার’ ফল হিসেবে দেখিয়ে নথিপত্র জালিয়াতি করেছেন।
মিথ্যা পুলিশ রিপোর্ট ও তথ্য গায়েব: কারারক্ষীরা উল্টো বন্দিদের আক্রমণকারী সাজিয়ে থানায় মিথ্যা রিপোর্ট দায়ের করে। এমনকি ঘটনার সময় ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজ, ছবি ও ভিডিওর মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে।
তদন্তে এই মারাত্মক ঘটনার জন্য সরাসরি তাইপিং কারাগারের পরিচালক নাজরি মোহাম্মদ এবং ডেপুটি পরিচালক শাহরুল ইজ্জাত হামিদকে দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অভিযুক্ত চিকিৎসাকর্মীদের বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ডিএপি জাতীয় চেয়ারম্যান ও ডিজিটালমন্ত্রী গোবিন্দ সিং দেও পুলিশ মহাপরিদর্শক ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে কঠোর জবাবদিহিতা দাবি করেছেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সুপরিকল্পিত গোষ্ঠীগত নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়ার পরও কেন তাইপিং কারাগারের প্রধান ওয়ার্ডেন রিন্ডে ও’নেল ভিক্টরের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ডিজিটালমন্ত্রী জানান, বিষয়টি আগামী সপ্তাহে সরাসরি দেশের মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে।
সুহাকামের তদন্ত প্যানেল তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে একটি নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক সুপারিশ করেছে। মানবাধিকার কমিশনের মতে, জরাজীর্ণ ও ঐতিহাসিক এই তাইপিং কারাগারটি বর্তমান যুগে আর কোনোভাবেই বন্দি রাখার উপযুক্ত বা মানবিক নয়। তাই এটি অবিলম্বে বন্ধ করে একটি রাষ্ট্রীয় জাদুঘরে রূপান্তর করা উচিত।







































