সোমবার । জুন ১, ২০২৬
স্পোর্টস ডেস্ক খেলা ১ জুন ২০২৬, ৩:০৭ অপরাহ্ন
শেয়ার

বিশ্বকাপ ২০২৬

যেভাবে ফুটবলের নতুন শক্তি হয়ে উঠলো মরক্কো


Morocco

দেশটির ফুটবল উন্নয়নের মূল ভিত্তি তিনটি—সুশাসন, আর্থিক বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ

একসময় আফ্রিকান ফুটবলে মাঝারি মানের দল হিসেবে পরিচিত ছিল মরক্কো। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন)-এর গ্রুপ পর্ব থেকেই নিয়মিত বিদায় নেওয়া এবং একের পর এক বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হওয়া দলটি এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম।

মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে মরক্কো উঠে এসেছে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তারা ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে পৌঁছায়, আর ২০২৬ বিশ্বকাপেও তাদের অন্যতম সম্ভাব্য শিরোপা প্রত্যাশী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে সাফল্য শুধু সিনিয়র পুরুষ দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বয়সভিত্তিক দল থেকে শুরু করে নারী ফুটবল ও ফুটসাল—সব ক্ষেত্রেই দারুণ সাফল্য পেয়েছে দেশটি।

সাফল্যের পেছনের তিন ভিত্তি
মরক্কোর ফুটবল ফেডারেশনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের মতে, দেশটির ফুটবল উন্নয়নের মূল ভিত্তি তিনটি—সুশাসন, আর্থিক বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ।

২০০৮ সালে স্কিরাত স্পোর্টস কনফারেন্সে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল উন্নয়ন পরিকল্পনার রূপরেখা দেন। এরপর শুরু হয় ফুটবলের অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কার।

দেশজুড়ে তৈরি করা হয় হাজার হাজার ছোট ফুটবল মাঠ, যেগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। পাশাপাশি রাজধানী রাবাতের কাছে নির্মাণ করা হয় অত্যাধুনিক মোহাম্মদ ষষ্ঠ ফুটবল কমপ্লেক্স ও একাডেমি।

এই একাডেমি থেকেই উঠে এসেছে জাতীয় দলের অনেক তারকা ফুটবলার, যাদের মধ্যে রয়েছেন নাইয়েফ আগুয়ের্দ, আজেদিন উনাহি ও ইউসুফ এন-নেসিরি।

প্রবাসী খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি
মরক্কোর উত্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ইউরোপে জন্ম নেওয়া মরক্কো বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে আনা। ফিফার খেলোয়াড় যোগ্যতা সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তনের পর মরক্কো দলে যোগ দেন হাকিম জিয়েচ, নরদিন আমরাবাত ও ব্রাহিম দিয়াজের মতো তারকারা।

সর্বশেষ আলোচিত নাম ১৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার আয়ুব বুয়াদি। ফরাসি ক্লাব লিলের এই তরুণ প্রতিভাকে ফ্রান্স জাতীয় দলে রাখার চেষ্টা হয়েছিল বলেও খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত মরক্কোর জার্সি বেছে নেন।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রজন্মের এই খেলোয়াড়রা আগামী এক দশকে মরক্কোর শক্তি আরও বাড়াবে।

আফকন বিতর্কের প্রভাব
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কোর ফুটবলে কিছু অস্থিরতাও দেখা দিয়েছে। ২০২৫ আফকন ফাইনালে সেনেগালের বিপক্ষে একটি বিতর্কিত পেনাল্টি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়।

ম্যাচের শেষ দিকে মরক্কোকে দেওয়া পেনাল্টির প্রতিবাদে সেনেগাল দল সাময়িকভাবে মাঠ ছেড়ে চলে যায়। পরে তারা ফিরে এলেও পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ব্রাহিম দিয়াজ। অতিরিক্ত সময়ে জয় পায় সেনেগাল।

এই ঘটনার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই। কয়েক সপ্তাহ পর তিনি পদত্যাগ করেন।

তার স্থলাভিষিক্ত হন মোহাম্মদ ওয়াহবি, যিনি মরক্কোর অনূর্ধ্ব-২০ দলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ও নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

২০২৬ বিশ্বকাপ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, মরক্কো এখন এমন একটি দল যারা যেকোনো বড় প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। তবে নতুন কোচের আক্রমণাত্মক কৌশল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কতটা কার্যকর হবে, সেটাই দেখার বিষয়।

তবুও মরক্কোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা শুধু ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে নয়। দেশটি ২০৩০ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক, এবং সেই আয়োজনকে তারা জাতীয় উন্নয়নের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে।

মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০৩০ বিশ্বকাপ আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এটি এমন একটি মাইলফলক, যা দেশের অবকাঠামো, পরিবহন, মানবসম্পদ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।’

ফলে বিশ্বকাপ ২০২৬ মরক্কোর জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল বিপ্লবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল