
সবুজ ঘাসের বুকে যেন রঙের মেলা, ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঠে যেদিকেই ক্যামেরা ঘুরছে, সেদিকেই ঝিলিক মারছে একটা নির্দিষ্ট রঙ। আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স কিংবা পর্তুগাল—দলের জার্সি যাই হোক না কেন, মাঠের প্রায় ৯০ ভাগ ফুটবলারের পায়েই এখন শোভা পাচ্ছে উজ্জ্বল গোলাপি রঙের জুতো। অথচ এই চেনা ভিড়েও ঠিক আলাদাভাবে চিনে নেওয়া যাচ্ছে একজনকে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা লিওনেল মেসির পায়ে কিন্তু সেই চেনা রঙের জুতো নেই।
যেখানে পুরো বিশ্ব একদিকে, সেখানে এলএম টেন হাঁটছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে। কিন্তু এত রঙ থাকতে হঠাৎ পুরো ফুটবল দুনিয়া কেন মেতে উঠল একই রঙে, আর সবার থেকে আলাদা হয়ে মেসিই বা পায়ে জড়ালেন কোন ইতিহাস—তা নিয়ে এখন চলছে তুমুল আলোচনা।
ফুটবলের আদি যুগে বুট মানেই ছিল কেবলই জমাট কালো রঙ। কালের বিবর্তনে সেখানে লাল, হলুদ, নীল বা সবুজের ছোঁয়া লাগলেও এবারের আসরের গল্পটা একদম ভিন্ন। নাইকি, এডিডাস কিংবা পুমার মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো এবার হাত মিলিয়েছে এক অদ্ভুত সমীকরণে। ২০২৪ সালেই ফ্যাশন দুনিয়ার ট্রেন্ড বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ডব্লিউজিএসএন পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালের বাজার শাসন করবে গোলাপি আর বেগুনির মিশ্রণে তৈরি ‘ইলেকট্রিক ফুশিয়া’ রঙটি। ব্র্যান্ডগুলো সেই সুযোগটাই লুফে নিয়েছে।
এটি শুধু মাঠের ফ্যাশন নয়, বরং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিখুঁত এক বাণিজ্যিক চাল। শুধু বুটেই ক্ষান্ত থাকেনি তারা, নামী দামী ক্লাবের জার্সির স্ট্রাইপেও এখন এই রঙের ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে। এর আরেকটি বড় কারণ হলো দৃশ্যমানতা। সবুজ মাঠের বুক চিরে এই উজ্জ্বল রঙটি ফ্লাডলাইটের আলোয় কিংবা টেলিভিশন ও মোবাইলের পর্দায় এতটাই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যে, দর্শকদের চোখ এড়ানো অসম্ভব। আর এই নিখুঁত ভিজ্যুয়াল ট্রিকস ব্র্যান্ডগুলোর প্রচারণাকে নিয়ে গেছে এক অন্য মাত্রায়।
তবে এই কর্পোরেট ট্রেন্ডের জোয়ারে গা ভাসাননি সবাই। ব্রাজিলের তরুণ তুর্কি এনড্রিক কিংবা আর্জেন্টিনার জাদুকর লিওনেল মেসির পায়ে এই গোলাপি বুট দেখা যায়নি। বিশেষ করে মেসির জন্য এডিডাস তৈরি করেছে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য এক জুতো। সম্ভবত নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা এই মহাতারকার বুটের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আলতিমো ট্যাঙ্গো’, যার অর্থ ‘দ্য লাস্ট ডান্স’। দূর থেকে দেখলে মনে হবে আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সির রঙেই রাঙানো হয়েছে এটি। যেখানে খোদাই করা আছে তিন তারকা খচিত বিশ্বজয়ের ট্রফি, মেসির নিজস্ব ব্র্যান্ড লোগো এবং তার আইকনিক ১০ নম্বর।
তবে এই বুটের আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর নিখুঁত বুননে। এডিডাস এই জুতোটিতে মেসির পুরো ক্যারিয়ারের একটা জীবন্ত কোলাজ ফুটিয়ে তুলেছে। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে মেসির পরা প্রথম সাদা-আকাশী বুট, ২০১০ সালের কালো জুতো, কিংবা ২০১৪, ২০১৮ এবং সবশেষ ২০২২ সালে কাতার জয়ের সেই সোনালী বুট—মেসির বিগত পাঁচটি বিশ্বকাপের প্রতিটি বুটের রঙের কোনো না কোনো ক্ষুদ্র অংশ, টেক্সচার কিংবা সুতোর সেলাই লুকিয়ে আছে এই নতুন জুতোর খাঁজে খাঁজে।
মাঠের বাকি ফুটবলাররা যখন কেবলই একটি নতুন ফ্যাশন বা ব্র্যান্ডের ট্রেন্ডকে পায়ে জড়িয়ে দৌড়াচ্ছেন, ঠিক তখন লিওনেল মেসি মাঠে নামছেন নিজের পুরো ফুটবল জীবনের ২০ বছরের ইতিহাস ও আবেগ সাথে নিয়ে। আর ঠিক এই কারণেই তিনি বাকি সবার চেয়ে আলাদা, বাকি সবার চেয়ে অনন্য।
ভিজুয়াল স্টোরি







































