বুধবার । জুন ২৪, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ওয়ার্ল্ডকাপ গোল গ্রাফ ২৪ জুন ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

বিশ্বকাপে ভাইকিং রো


ঐতিহ্যবাহী ভাইকিং রো

ফুটবল বিশ্বকাপ কি শুধুই মাঠের খেলা?নাকি জয়-পরাজয় কিংবা তারকাখ্যাত খেলোয়াড়দের গল্প, নাকি সংস্কৃতি, পরিচয় এবং সমষ্টিগত আবেগেরও এক মহামঞ্চ! প্রতি বিশ্বকাপেই কোনো না কোনো দেশের সমর্থকগোষ্ঠী তাদের স্বতন্ত্র উদযাপন কিংবা গ্যালারি কালচার এর কারনে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে সেই আলোচনার কেন্দ্রে নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’—একটি অভিনব, ছন্দময় এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিবাহী  উদযাপন, যা স্টেডিয়ামের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকী প্রচার।

বিশ্বকাপের গ্যালারিতে লাল পোশাক পরা নরওয়েজিয়ান সমর্থকদের সারিবদ্ধভাবে বসে বৈঠা চালানোর ভঙ্গি প্রথমে অনেকের কাছেই ছিল কৌতূহলের বিষয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এই দৃশ্য পরিণত হয় টুর্নামেন্টের অন্যতম ভাইরাল মুহূর্তে যখন কিনা নরওয়ের প্লেয়াররা রাউন্ড অফ থার্টি টু নিশ্চিত করার পরে ড্রামের তালে তালে শুরু করে ‘রু রু রু’ ।

প্রথম দর্শনে হয়তো নিছক বিনোদন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন নর্স ঐতিহ্যের প্রতিধ্বনি। সারিবদ্ধভাবে বসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বৈঠা চালানোর ভঙ্গি—যেন সমুদ্রপথে যুদ্ধ কিংবা অভিযানে ছুটে চলা প্রাচীন ভাইকিং লংশিপের নাবিকেরা। ধীর লয়ের ডামাডোলে তালে তালে শুরু হওয়া এই সমবেত ‘বৈঠা চালানো’ ক্রমশ গতি পায়, আর শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক আবেগঘন উল্লাসে। এতে ইতিহাস, নাটকীয়তা এবং দলগত সংহতির এক অনন্য সংমিশ্রণ তৈরি হয় স্টেডিয়ামে।

এই ‘ভাইকিং রো’-এর শক্তি কেবল এর অভিনবত্বে নয়, বরং প্রতীকী অর্থে। ইতিহাস বলে, ভাইকিং যোদ্ধারা নৌকায় দীর্ঘ সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে যুদ্ধে যেতেন। সেই যাত্রায় প্রত্যেক বৈঠা চালকের তাল, শক্তি ও সমন্বয় ছিল অপরিহার্য। আধুনিক নরওয়ের সমর্থকেরা সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে ফুটবলের ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এখানে বৈঠা চালানো মানেই একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার, দল ও জাতির ঐক্যের প্রকাশ।

বিশ্ব ফুটবলে আইসল্যান্ডের ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’ একসময় যেমন বিস্ময় জাগিয়েছিল, নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’ যেন তারই নতুন অধ্যায়। তবে এটি কেবল গ্যালারির কোরিওগ্রাফি নয়; বরং একটি চলমান সাংস্কৃতিক পারফরম্যান্স। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেরা নরওয়ে যেন তাদের ফুটবল পুনর্জাগরণের গল্পকে জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে দিতে চেয়েছে। সেই কারণেই দলটির বিশ্বকাপ যাত্রার সূচনাও ছিল ব্যতিক্রমী। প্রচলিত বিমানসিঁড়ির দলীয় ছবির বদলে খেলোয়াড়রা অংশ নিয়েছিলেন “The Vikings Are Coming” শিরোনামের এক বিশেষ ফটোশুটে। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—নরওয়ে ফুটবল দল নিজেদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের প্রতিনিধিও। ফিফা বাঁধ সাধলে নরওয়ের পার্লামেন্টে একই উদযাপন করে নরওয়েজিয়ানরা বুঝিয়ে দেয় এটা তাঁদের ঐতিহ্য।

এই বিশ্বকাপে ‘ভাইকিং রো’-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বিস্তার। সাধারণত সমর্থকদের কোনো উদযাপন স্টেডিয়ামের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু নরওয়ের সমর্থকেরা সেটিকে জনজীবনের অংশে পরিণত করেছেন। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, সাবওয়ের এসকেলেটর, শহরের রাস্তাঘাট—সবখানেই দেখা গেছে শত শত মানুষকে একসঙ্গে বসে বৈঠা চালানোর ভঙ্গিতে দুলতে। বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলোতে এটি যেন এক চলমান সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব দৃশ্য ‘ভাইকিং রো’-কে টুর্নামেন্টের অন্যতম ভাইরাল মুহূর্তে পরিণত করেছে।

বিশ্বকাপে নরওয়ের দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান এই উদযাপনকে সত্যি সত্যি বিশেষ আবেগময় মাত্রা দিয়েছে। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেরা দলটি যখন সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ গোলের স্নায়ুচাপের জয় নিশ্চিত করে নকআউট পর্বে পৌঁছে যায়, তখন ‘ভাইকিং রো’ আর কেবল গ্যালারির সম্পদ থাকেনি। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড, গোলদাতা আর্লিং হলান্ড এবং কোচ স্তালে সোলবাকেন নিজেই সমর্থকদের সঙ্গে মাঠে বসে সেই বৈঠা চালানোর আচার সম্পন্ন করেন। খেলোয়াড়, কোচ ও সমর্থক—সব বিভাজন যেন মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায় এক যৌথ অভিজ্ঞতায়। খেলোয়াড়, কোচ এবং দর্শকের মধ্যে যে অদৃশ্য দূরত্ব আধুনিক ফুটবলে প্রায়শই দেখা যায়, সেই মুহূর্তে তা যেন বিলীন হয়ে গেল। মাঠের ঘাসের ওপর তৈরি হলো এক প্রতীকী ভাইকিং জাহাজ, যার বৈঠা টানছিলেন সবাই মিলে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই উন্মাদনা নরওয়ের রাজনৈতিক পরিসরেও প্রবেশ করেছে। দেশটির সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষে একযোগে ‘ভাইকিং রো’ পরিবেশন করেছেন জাতীয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে। স্পিকারের হাতুড়ির তালে সংসদ সদস্যদের সমবেত বৈঠা চালানো নিছক মজার ঘটনা নয়; এটি দেখায় কীভাবে একটি ক্রীড়া-উদযাপন জাতীয় সংহতির প্রতীকে রূপ নিতে পারে। রাজনীতি, ক্রীড়া এবং সাধারণ মানুষের আবেগ—তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্র এখানে এসে মিলেছে এক বিন্দুতে।

মূলত ‘ভাইকিং রো’-এর সাফল্যের রহস্য এর প্রতীকী শক্তিতে। এটি নরওয়ের অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে, ব্যক্তিকে সমষ্টির অংশে পরিণত করে এবং ফুটবলকে কেবল একটি খেলার সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় পরিচয়ের উৎসবে রূপ দেয়। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে এমন সাংস্কৃতিক উপস্থাপন একটি দেশের সফট পাওয়ারেরও প্রকাশ। বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক হয়তো নরওয়ের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না, কিন্তু ‘ভাইকিং রো’-এর মাধ্যমে তারা নরওয়ের আত্মপরিচয়ের একটি দৃশ্যমান রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের বহু গোল, বহু নাটকীয় ম্যাচ হয়তো সময়ের সঙ্গে স্মৃতি থেকে মুছে যাবে। কিন্তু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসা হাজারো নরওয়েজিয়ান সমর্থক, ঢাকের তালে তালে এগিয়ে চলা এক কল্পিত ভাইকিং জাহাজ, আর সেই জাহাজে খেলোয়াড়-সমর্থক-রাজনীতিকের একসঙ্গে বৈঠা চালানোর দৃশ্য—সম্ভবত বিশ্বকাপের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে এক স্মরণীয় প্রতীক হয়ে থাকবে। কারণ ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি কখনো শুধু গোল নয়; বরং মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া সেই সম্মিলিত গল্প, যার নাম—ঐক্য।