
২০২৬ বিশ্বকাপ ছড়িয়ে পড়েছে তিনটি দেশ ও ১৬টি শহরে। ফলে ফুটবলপ্রেমীরা যেমন উপভোগ করছেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য, তেমনি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন উত্তর আমেরিকার কিছু অসাধারণ স্টেডিয়ামও।
মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়াম—যেখানে আগামী ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল—প্রতিটি ভেন্যুই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ করেছে খেলোয়াড়, সমর্থক ও সংবাদকর্মীদের।
তবে কোন স্টেডিয়াম সবচেয়ে বেশি ছাপ ফেলেছে? কোনটি প্রত্যাশা পূরণ করেছে, আর কোনটি কিছুটা হতাশ করেছে? বিবিসি স্পোর্টসের প্রতিবেদকরা জানিয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতার কথা।

আজতেকা স্টেডিয়াম, মেক্সিকো: ইতিহাসের সুবাসে মোড়া
বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভের সিনিয়র ধারাভাষ্যকার জন মারে মনে করেন, আজতেকা স্টেডিয়ামের মতো ঐতিহাসিক আবহ আর কোথাও নেই।
১৯৭০ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের কিংবদন্তি গোল এবং ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার অবিস্মরণীয় মুহূর্ত—সবকিছুর সাক্ষী এই স্টেডিয়াম। আধুনিক সংস্কার করা হলেও এর ঐতিহাসিক আবেদন অটুট রয়েছে।
মারের ভাষায়, ‘উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকান সমর্থকদের রঙিন সোমব্রেরো আর উচ্ছ্বাসের দৃশ্য আমি কোনোদিন ভুলব না। আমার মতে, এই বিশ্বকাপের সেরা মঞ্চ এটিই—এমনকি ফাইনালটাও এখানে হওয়া উচিত ছিল।’

বোস্টন স্টেডিয়াম: দুর্দান্ত দৃশ্য, কিন্তু পৌঁছানো কঠিন
সাবেক স্কটল্যান্ড উইঙ্গার প্যাট নেভিন বোস্টন স্টেডিয়ামের দর্শনীয় গ্যালারির প্রশংসা করেছেন। খাড়া গ্যালারির কারণে প্রতিটি আসন থেকেই মাঠ ভালোভাবে দেখা যায়।
তবে তিনি মজা করে বলেন, ‘আমরা যারা একেবারে ওপরে বসি, তাদের কাছে এরলিং হালান্ডকেও পিঁপড়ার মতো লাগে!’
যাতায়াতের ঝামেলা এবং পর্যাপ্ত নির্দেশনা না থাকার বিষয়টি অবশ্য তার কাছে নেতিবাচক দিক হিসেবে ধরা দিয়েছে।

সিয়াটল স্টেডিয়াম: প্রকৃতি আর ফুটবলের নিখুঁত মেলবন্ধন
বিবিসি প্রতিবেদক গ্যারি রোজের মতে, সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডই তার দেখা বিশ্বকাপের সেরা স্টেডিয়াম। একদিকে সিয়াটলের সুউচ্চ অট্টালিকা, অন্যদিকে তুষারঢাকা মাউন্ট রেইনিয়ারের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য—স্টেডিয়ামটিকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য।
এর বাঁকানো ছাদ দর্শকদের গর্জনকে আরও তীব্র করে তোলে। রোজের ভাষায়, ‘এখানকার শব্দে স্টেডিয়াম যেন কেঁপে ওঠে। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।”

ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম: উৎসবমুখর সমর্থকদের মিলনমেলা
ফিলাডেলফিয়া শহর বিশ্বকাপকে আপন করে নিয়েছে বলেই মনে করেন বিবিসি প্রতিবেদক নিল জনস্টন। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সমর্থকদের জমায়েত, বিখ্যাত ‘রকি’ ভাস্কর্যের সামনে উচ্ছ্বাস আর স্টেডিয়ামের প্রাণবন্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে ফুটবল উৎসবের এক আদর্শ কেন্দ্র।
বিশেষ করে ব্রাজিল-হাইতি ম্যাচে দুই দলের সমর্থকদের একসঙ্গে নাচ-গান ছিল তার জন্য স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

ডালাস স্টেডিয়াম: আধুনিকতার প্রতীক
বিবিসির প্রধান ফুটবল লেখক ফিল ম্যাকনাল্টির মতে, ডালাস স্টেডিয়াম আধুনিক সুবিধার এক অনন্য উদাহরণ। বন্ধ ছাদ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ গরম আবহাওয়ার মধ্যেও দর্শক ও খেলোয়াড়দের স্বস্তি দিচ্ছে। বিশাল স্ক্রিন, প্রশস্ত করিডর এবং সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা এটিকে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ভেন্যুতে পরিণত করেছে।

নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি ও আটলান্টা: বিস্ময় আর স্বাচ্ছন্দ্যের দুই নাম
বিবিসি’র সিনিয়র প্রতিবেদক ইয়ান ডেনিসের কাছে নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের বিশালতা অবিশ্বাস্য। তার কাছে স্টেডিয়ামে মনে হয়েছিল, যেন মেঘ ছুঁতে পারবেন।
তবে দর্শকসেবার দিক থেকে তার পছন্দ আটলান্টা স্টেডিয়াম। কাচ ও ইস্পাতের আধুনিক নকশা, বিশাল বৃত্তাকার স্ক্রিন এবং ব্যতিক্রমী স্থাপত্য এটিকে আলাদা করেছে।

কানসাস সিটি স্টেডিয়াম: মেসির ইতিহাস গড়ার মঞ্চ
এলিজাবেথ কনওয়ের কাছে অ্যারোহেড স্টেডিয়াম বিশেষ হয়ে উঠেছে লিওনেল মেসির কারণে। আর্জেন্টিনার হয়ে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখেন মেসি। সূর্যাস্তের আলোয় আলোকিত স্টেডিয়াম আর দর্শকদের গর্জন মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল অবিস্মরণীয়।
সেরা স্টেডিয়াম নিয়ে মতভেদ, তবে এগিয়ে সিয়াটল ও আজতেকা
বিবিসির বিভিন্ন প্রতিবেদকের মতামত ভিন্ন হলেও সিয়াটলের লুমেন ফিল্ড এবং ডালাস স্টেডিয়াম সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে। অন্যদিকে ইতিহাস, আবেগ এবং ঐতিহ্যের কারণে আজতেকা স্টেডিয়াম এখনও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে।
বিশ্বকাপের লড়াই যত এগোচ্ছে, ততই এসব স্টেডিয়াম নতুন নতুন স্মৃতির জন্ম দিচ্ছে—যেগুলো হয়তো আগামী বহু বছর ধরে ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।









































