
বিশ্বের শীর্ষ ধনী নারী অ্যালিস ওয়ালটন
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী খুচরা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ালমার্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটনের একমাত্র কন্যা অ্যালিস ওয়ালটন ২০২৫ সালেও বিশ্বের শীর্ষ ধনী নারীর মুকুট নিজের দখলে রেখেছেন।
তবে এই ৭৫ বছর বয়সী শত বিলিয়নিয়ারের পরিচয় কেবল তাঁর বিপুল সম্পত্তির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। যেখানে তাঁর ভাইয়েরা ওয়ালমার্টের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য পরিচালনায় ব্যস্ত, সেখানে অ্যালিস নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন প্রখ্যাত শিল্প সংগ্রাহক, সমাজসেবক এবং স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারক হিসেবে।
বর্তমানে প্রায় ১০১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক অ্যালিস চলতি বছরেই তাঁর ঝুলিতে নতুন করে ২৮.৭ বিলিয়ন ডলার যুক্ত করেছেন, যার মূল কারণ ওয়ালমার্টের শেয়ার বাজারে অভাবনীয় উত্থান।
অ্যালিসের জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ। মাত্র ১০ বছর বয়সে ২ ডলারে পিকাসোর একটি চিত্রকর্মের অনুলিপি কেনা থেকেই তাঁর এই যাত্রার শুরু। নিজের শহর আরকানসাসের বেন্টনভিলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ক্রিস্টাল ব্রিজেস মিউজিয়াম অব আমেরিকান আর্ট’।
১২০ একর জমির ওপর নির্মিত এই জাদুঘরটি এখন মার্কিন শিল্পের এক বিশাল ভাণ্ডার। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম দামি চিত্রকর্ম অ্যাশার বি. ডুরান্ডের ‘কিন্ড্রেড স্পিরিটস’, যা তিনি ৩৫ মিলিয়ন ডলারে কিনেছিলেন। এছাড়াও অ্যান্ডি ওয়ারহোলের পপ আর্ট, নরম্যান রকওয়েলের কালজয়ী ‘রোজি দ্য রিভেটার’ এবং জর্জিয়া ও’কিফের বিশ্ববিখ্যাত ‘জিমসন উইড/হোয়াইট ফ্লাওয়ার নং ১’ তাঁর সংগ্রহের অনন্য সম্পদ।
শিল্পকলাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা এবং প্রান্তিক অঞ্চলের জাদুঘরগুলোকে সহায়তা করার জন্য তিনি ‘আর্ট ব্রিজেস ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বতন্ত্র সংস্থাও পরিচালনা করছেন।
অ্যালিস ওয়ালটনের সমাজসেবামূলক কাজের একটি নতুন এবং বৈপ্লবিক দিক উন্মোচিত হয়েছে ২০২৫ সালে। এই বছরের জুলাই মাসে বেন্টনভিলে তাঁর নিজের নামাঙ্কিত ‘অ্যালিস এল. ওয়ালটন স্কুল অব মেডিসিন’ আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৮ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর প্রথম ব্যাচকে স্বাগত জানিয়েছে। এই মেডিকেল স্কুলটি প্রচলিত চিকিৎসা শিক্ষার বাইরে গিয়ে ‘হোল হেলথ’ (Whole Health) বা পূর্ণাঙ্গ সুস্থতার ওপর ভিত্তি করে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
এই বিশেষ ‘আর্চেস’ কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের কেবল ওষুধ নয় বরং শিল্পকলা, মানবিকতা এবং পুষ্টির গুরুত্বও শেখানো হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই স্কুলের প্রথম পাঁচটি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো টিউশন ফি বা পড়ার খরচ দিতে হবে না। অ্যালিস নিজে এই বিশাল ব্যয় ভার বহন করছেন।
ব্যক্তিজীবনে অ্যালিস কিছুটা অন্তরালে থাকতেই পছন্দ করেন। তিনি দুবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও কোনোটিই টেকেনি এবং তিনি নিঃসন্তান। তবে নিজের বিশাল সম্পদকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত বিলাসিতার মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদী মূল্য তৈরি করতে পারে।
১৯৮০-র দশকে অ্যালিস একাধিকবার ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন, যার মধ্যে মেক্সিকোতে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং সুস্থ হতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। এই শারীরিক যন্ত্রণা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েনের মতো প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসা এই নারী আজ বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা, যিনি প্রমাণ করেছেন যে ধনকুবের হয়েও কীভাবে শিল্পের কোমলতা আর মানবতার সেবা দিয়ে পৃথিবীকে আরও সুন্দর করা যায়।












































