রবিবার । মার্চ ২২, ২০২৬
রাজদীপ সারদেশাই জাতীয় ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৪:১৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

কে নির্ধারণ করছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি?


Rajdeep

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কে নির্ধারণ করছেন—এই প্রশ্নটি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে এর উত্তর সহজ মনে হতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. এস. জয়শঙ্করই সরকারের আন্তর্জাতিক কূটনীতির মুখ। অভিজ্ঞ ও বহুল ভ্রমণকারী এই কূটনীতিক তাঁর তীক্ষ্ণ বক্তব্য ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত আলোচিত হন। কিন্তু বাস্তবে সাউথ ব্লকে নীতিনির্ধারণের নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে—তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই বিভ্রান্তির স্পষ্ট উদাহরণ।

ঢাকা সফর ও আকস্মিক মোড়
৩১ ডিসেম্বর ড. জয়শঙ্কার ঢাকায় যান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তিনি খালেদা জিয়ার পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমানে চেয়ারম্যান) তারেক রহমানের হাতে শোকবার্তা পৌঁছে দেন। তারেক রহমানের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর করমর্দনের ছবি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের শীতলতার পর একটি ইতিবাচক বার্তার ইঙ্গিত দেয়। অনেকের চোখে এটি ছিল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি কূটনৈতিক প্রয়াস।

কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

মোস্তাফিজুর রহমান বিতর্ক
দুই দিন পরই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে (কেকেআর) তাদের চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের তালিকা থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ফ্র্যাঞ্চাইজিটি কোনো আপত্তি ছাড়াই সেই নির্দেশ মানে। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সরকার ও ক্রিকেট বোর্ড তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় এবং প্রতিবাদস্বরূপ আগামী মাসে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।

প্রশ্ন উঠছে—মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে কী এমন বদলে গেল যে একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগের পরপরই একজন ক্রীড়াবিদকে লক্ষ্য করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?

‘ফ্রিঞ্জ’ নাকি মূলধারা?
এই সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন ছিল হিন্দুত্ববাদী তথাকথিত ‘ফ্রিঞ্জ’ গোষ্ঠীগুলোর উচ্চকণ্ঠ প্রচার, যারা বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগকে সামনে রেখে মোদি সরকারকে ঢাকার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানায়।

উত্তর প্রদেশের বিজেপি বিধায়ক সঙ্গীত সোম প্রকাশ্যে কেকেআরের মালিক শাহরুখ খানকে ‘গাদ্দার’ আখ্যা দেন, মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ার জন্য। তিনি কৌশলে অন্য মালিকদের নাম এড়িয়ে যান। সমালোচকদের মতে, ‘খান’ পদবি থাকলেই হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার সহজ লক্ষ্য হওয়া যায়।

স্বাভাবিক সময়ে একটি দায়িত্বশীল সরকার এই ধরনের বক্তব্য উপেক্ষা করত। কিন্তু ‘নতুন ভারতে’ এই তথাকথিত ফ্রিঞ্জ শক্তিই এখন মূলধারায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় সমর্থকগোষ্ঠীর চাপ উপেক্ষা করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সেই আবেগ যখন সংবেদনশীল পররাষ্ট্রনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

ক্রিকেট, ক্ষমতা ও রাজনীতি
এটি কেবল খেলাধুলা ও রাজনীতির বিভাজনের প্রশ্ন নয়। উপমহাদেশে ক্রিকেট ভারতের ‘সফট পাওয়ার’-এর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বিসিসিআই বিশ্ব ক্রিকেটে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পুত্র জয় শাহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সভাপতি—যা এই প্রভাবকে আরও দৃঢ় করেছে।

পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত না মেলানো হোক বা বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে কার্যত বয়কট করা—ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো ক্রমেই রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনার পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্বের তাৎক্ষণিক নির্দেশ বলেই দেখা হচ্ছে।

তাহলে কে ঠিক করছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি?
এতে করে আবারও প্রশ্ন উঠে আসে—ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কি পেশাদার কূটনীতিকদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপির সংঘ পরিবারভুক্ত রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোই কার্যত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?

ভারতের কূটনৈতিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। বিপরীতে রাজনৈতিক নেতারা আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে আবেগকে পুঁজি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়াকে ভোটের কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ধারাবাহিকতার অভাব
বাংলাদেশ ছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগনির্ভর সিদ্ধান্তের একাধিক উদাহরণ রয়েছে। ২০২৪ সালে মালদ্বীপের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন, ২০২৩ সালে তুরস্কের সেলেবি কোম্পানির নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল, কিংবা ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর চীনের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে বয়কটের ডাক—সব ক্ষেত্রেই পরিণত কূটনীতির বদলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রাধান্য পেয়েছে।

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, একদিকে চীনের সঙ্গে কংগ্রেসের যোগাযোগকে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ বলা হয়েছিল, অন্যদিকে এখন বিজেপি-আরএসএস নেতৃত্ব চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিদলকে স্বাভাবিকভাবেই স্বাগত জানাচ্ছে।

শেষ কথা
কয়েক দিন আগে একটি শপিং মলে দেখা গেল, তরুণদের ভিড় লেগে আছে ছাড়মূল্যে বিক্রি হওয়া সোয়েটার কিনতে। পোশাকের ট্যাগে লেখা—‘মেড ইন বাংলাদেশ’। বিশ্লেষকদের মতে, একটি ক্রিকেটারকে নিশানা করা সহজ, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার প্রশ্নে আবেগ দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি চালানো যায় না।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন থেকেই যায়—ভারতের পররাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তি আসলে কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, না কি রাজনৈতিক আবেগ?

ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে থেকে অনূদিত