রবিবার । মে ৩১, ২০২৬
স্পোর্টস ডেস্ক খেলা ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ৭:৩৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বয়কটের যত ঘটনা


icc-trophy

ছবি: সংগৃহীত

ক্রিকেটকে সাধারণত ব্যাট–বলের লড়াই হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন বহু মুহূর্ত রয়েছে, যখন মাঠের বাইরের রাজনীতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন সরাসরি খেলার ওপর প্রভাব ফেলেছে। কখনো দল ম্যাচ খেলতে নামেনি, কখনো পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই সরে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বয়কটের এসব ঘটনা ক্রীড়ার ইতিহাসে রেখে গেছে গভীর ছাপ।

বর্ণবাদের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার দীর্ঘ নির্বাসন: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রভাবশালী বয়কটের শিকার হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশটির বর্ণবাদী নীতির প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) তাদের নিষিদ্ধ করে। এর ফলে ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে কার্যত নির্বাসিত ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩ ও ১৯৮৭—এই চারটি বিশ্বকাপে তারা অংশ নিতে পারেনি। ১৯৯১ সালে বর্ণবাদ প্রথার অবসানের পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের প্রত্যাবর্তন ঘটে।

১৯৯৬ বিশ্বকাপ- নিরাপত্তা শঙ্কায় ওয়াকওভার: বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বয়কট ঘটে ১৯৯৬ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে হওয়া এই টুর্নামেন্টে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ ও কলম্বোর বোমা হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে শ্রীলঙ্কা দুটি ম্যাচে ওয়াকওভার পায়। তবু সেই শ্রীলঙ্কাই শেষ পর্যন্ত ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

২০০৩ বিশ্বকাপ- রাজনীতির সরাসরি হস্তক্ষেপ: ২০০৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বয়কট আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ নেয়। জিম্বাবুয়েতে রবার্ট মুগাবে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে ইংল্যান্ড হারারেতে ম্যাচ খেলতে যায়নি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা শঙ্কার কথা বলে নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। দুই দলের ওয়াকওভারে লাভবান হয় জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেনিয়া ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে ওঠে।

পুরো টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানো জিম্বাবুয়ে: ২০০৯ সালের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জিম্বাবুয়ে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভিসা জটিলতার কারণে তারা পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই সরে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের জায়গায় বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় স্কটল্যান্ড।

বাংলাদেশে যুব বিশ্বকাপ ও অস্ট্রেলিয়ার অনুপস্থিতি: ২০১৬ সালের অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে আয়োজক ছিল বাংলাদেশ। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে অস্ট্রেলিয়া দল এই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি। আইসিসি অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে। তাদের পরিবর্তে খেলেছিল আয়ারল্যান্ড।

ভারত–পাকিস্তান প্রসঙ্গ: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বয়কটের ঘটনা ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। দীর্ঘদিন পর পাকিস্তানে আইসিসি টুর্নামেন্ট আয়োজন হলেও ভারত সরকার অনুমতি না দেওয়ার অজুহাতে সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত আইসিসির সঙ্গে সমঝোতায় ভারতের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যু দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ- নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে না খেলার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের: ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাঠে খেলতে যাচ্ছে না বাংলাদেশ। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এই ম্যাচগুলো অন্য ভেন্যুতে সরানোর জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল, কিন্তু আইসিসি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে বাংলাদেশের পরিবর্তে টুর্নামেন্টে স্কটল্যান্ডকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

খেলার বাইরের বাস্তবতা, মাঠের ভেতরের প্রভাব: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বয়কটের এসব ঘটনা প্রমাণ করে—ক্রিকেট কেবল খেলাই নয়, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিরাপত্তা বাস্তবতা ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তেরও প্রতিফলন। অনেক সময় মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তই মাঠের ভেতরের ফলাফল বদলে দিয়েছে। ক্রিকেট ইতিহাসে বয়কটের অধ্যায়গুলো তাই খেলাধুলার পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।