রবিবার । মার্চ ২২, ২০২৬
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু জাতীয় ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৬:৩৭ অপরাহ্ন
শেয়ার

ডাকসুকে বেশ্যালয় বলার রাজনীতি: অসুস্থ চিন্তার হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোথায়?


Dulu bhai

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক শক্তিশালী প্রতীক। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক চর্চার নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। সেই ডাকসুকে ‘বেশ্যালয়’ বলা শুধু একটি অশালীন বক্তব্য নয়, এটি রাষ্ট্রের ইতিহাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত।
এই বক্তব্য এসেছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর একজন নেতার মুখ থেকে। বিষয়টি তাই ব্যক্তিগত সীমায় আটকে নেই; এটি দলীয় নেতৃত্বের নৈতিকতা, রাজনৈতিক দর্শন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। কারণ একজন নেতার ভাষা কেবল তার ব্যক্তিগত মনোভাব নয়, তা তার দলের আদর্শিক অবস্থানের প্রতিফলন।

রাজনীতি মানে মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে, তর্ক হবে। কিন্তু রাজনীতি কখনোই কুরুচি, অবমাননা ও নারী-অবমাননাকর উপমার জায়গা হতে পারে না। ‘বেশ্যালয়’ শব্দ ব্যবহার করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করা মানে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নয়, নারীর মর্যাদা ও মানবিক অবস্থানকেও অবমাননার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের নৈতিকতার রাজনীতি হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু নৈতিকতা কি গালিগালাজ, অবমাননা ও ইতিহাস-অস্বীকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যায়? নৈতিকতা কি সমাজকে বিভক্ত করে, নারীকে অপমান করে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবমাননা করে গড়ে ওঠে? এই প্রশ্নগুলো আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

এই বক্তব্য একটি গভীরভাবে অসুস্থ রাজনৈতিক মানসিকতার প্রকাশ, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা হয়, ইতিহাসকে অস্বীকার করা হয়, এবং প্রতিষ্ঠানকে সম্মান নয়, অপমানের ভাষায় দেখা হয়। ধর্মের নামে রাজনীতি করার দাবি যারা করেন, তাদের ভাষা হওয়া উচিত সবচেয়ে সংযত, সবচেয়ে মানবিক, সবচেয়ে দায়িত্বশীল। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি তার উল্টো চিত্র।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ইতোমধ্যেই সংকটে রয়েছে। নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সহিংসতা—সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে। এই সংকটের ওপর যদি ভাষার নৈতিক পতন যুক্ত হয়, তবে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হয়ে যায়। কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মানসিকতা তৈরি করে, আচরণ গড়ে তোলে, এবং সমাজের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে।

ডাকসু বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকেই বহু জাতীয় নেতা উঠে এসেছেন। এই প্রতিষ্ঠানকে অপমান করা মানে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা। প্রশ্ন হলো, যারা আজ ডাকসুকে ‘বেশ্যালয়’ বলতে পারেন, তারা কি আগামী প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক চর্চায় উদ্বুদ্ধ করবেন, নাকি রাজনীতি থেকে বিমুখ করে তুলবেন?

এখানে দলীয় নেতৃত্বের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। একটি দলের একজন নেতা যখন এই ধরনের বক্তব্য দেন, তখন সেটিকে ব্যক্তিগত মত বলে দায় এড়ানো যায় না। যদি দলীয় নেতৃত্ব প্রকাশ্যে এই ভাষার নিন্দা না করে, যদি তারা স্পষ্ট অবস্থান না নেয়, তবে তা কার্যত সেই বক্তব্যের নৈতিক সমর্থন হিসেবেই বিবেচিত হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ কী ধরনের রাজনীতি বেছে নিচ্ছি তার ওপর। আমরা কি এমন রাজনীতি চাই, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, নারী, ইতিহাস ও ভিন্নমতকে অবমাননা করা হবে? নাকি আমরা এমন রাজনীতি চাই, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা হবে সম্মানজনক, যুক্তিনির্ভর ও মানবিক?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নয়; এটি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের কাছেও। নীরবতা মানে সম্মতি, আর সম্মতি মানে এই ধরনের রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়া। তাই এখনই সময় স্পষ্টভাবে বলা—ডাকসুকে অবমাননা, নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা এবং ইতিহাসকে গালির মাধ্যমে অস্বীকার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, বিশেষ করে যারা ভাষার মাধ্যমে সমাজকে বিষাক্ত করে তোলে। আজ যদি আমরা এই অসুস্থ চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ব্যর্থ হই, তবে আগামীর বাংলাদেশ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে, যেখানে নৈতিকতা নয়, কুরুচিই হবে রাজনীতির ভাষা।

রাজনীতি জান্নাত ও বেশ্যালয়ের উপমায় চলে না। রাজনীতি চলে যুক্তি, নীতি ও মানবিক মূল্যবোধে। যারা এই সত্য অস্বীকার করে, তারা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, গোটা দেশের ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]