রবিবার । মার্চ ২২, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিণত তারেক রহমানকেই এগিয়ে রাখছে ইকোনমিস্ট


Tarique Rahman

তারেক রহমান ।। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এগিয়ে রেখেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট।

সোমবার প্রকাশিত সাময়িকীটির সর্বশেষ সংখ্যায় বিশ্লেষণে বলা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় দেড় দশক পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ১৮ মাস আগে ঘটে যাওয়া এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ইকোনমিস্টের ভাষায়, ওই আন্দোলনে জেন জি প্রজন্মের বিক্ষোভকারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ফলে দেশে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমানকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্য ইকোনমিস্ট একা নয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গও তাদের বিশ্লেষণে একই ধরনের পূর্বাভাস দিয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার দৃশ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বুলেটপ্রুফ বাসে করে তারেক রহমান ঢাকায় প্রবেশের সময় উত্তেজিত সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে পড়েন এবং বাসটি প্রতি কয়েক মাইল পরপর ধীরগতিতে চলছিল, যাতে অপেক্ষমাণ সমর্থকেরা তাকে এক নজর দেখতে পারেন।

ইকোনমিস্টের মতে, বাংলাদেশে সর্বশেষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালে। এর পর থেকে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনোই প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) শাফকাত মুনিরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‌‘আমার জীবনের দুই দশক ধরে আমার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না।’ বর্তমানে ঢাকার সড়কগুলো নির্বাচনী ব্যানারে ভরে উঠেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন হবে শেষ বড় দায়িত্ব। অধিকাংশ মানুষের মতে, এই সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে ভূমিকা রেখেছে, যখন তা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছিল।

ইকোনমিস্ট জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন সংস্কারের খসড়া তৈরি করেছে, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথ বন্ধ করা। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং প্রধানমন্ত্রীদের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা।

প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গও উঠে আসে। দলটি নির্বাচিত হলে সব বাংলাদেশির জন্য মধ্যপন্থী শাসনের আশ্বাস দিলেও শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে তাদের অগ্রগতি উদ্বেগ সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করা হয়। বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, দলটি এবার কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি এবং নারীদের কাজের সময় সীমিত করার একটি প্রস্তাব নিয়ে তারা সমালোচনার মুখে পড়েছে। পাশাপাশি সংসদে কখনো ১৮টির বেশি আসন না পাওয়া দলটির রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

ইকোনমিস্টের মতে, এসব পরিস্থিতিই তারেক রহমানের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। জরিপে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিশ্লেষণে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, দীর্ঘদিন বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তার আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে বিএনপি তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।

ইকোনমিস্ট লিখেছে, নির্বাচিত হলে তারেক রহমান বিনিয়োগকারীদের সহায়তা দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশে উচ্চ আয়ের চাকরির জন্য তরুণদের প্রশিক্ষণ এবং পানি সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তারেক রহমানের অগ্রাধিকার হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের জন্য বিচার নিশ্চিত করার কথাও তিনি বলেছেন, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করবেন না বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়, তারেক রহমান মনে করেন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে—জনগণের জন্য কার্যকর কর্মসূচি না থাকলে যে কোনো সরকারই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরোধিতা করেন।

প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়, দেশে ফেরার পর তারেক রহমান অনেকের প্রত্যাশিত কথাই বলছেন, যদিও অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে এখনো প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছুক। পর্যবেক্ষকদের মতে, লন্ডন থেকে ফিরে আসা এই তারেক রহমান আগের চেয়ে ভিন্ন ও পরিণত একজন রাজনীতিক হিসেবে ধরা দিচ্ছেন।