
ছবি: সংগৃহীত
জুলাই অভ্যুত্থানের পর গত ১৭ মাসে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির দাবি, এই সময়কালে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিক নির্যাতন, সংখ্যালঘু ও নারী-শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণহানি ও সহিংসতার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক্-নির্বাচনি সহিংসতা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসব তথ্য জানায় এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে ১৫টি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ এবং সংস্থাটির নিজস্ব অনুসন্ধানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক ও দলীয় সহিংসতার ১ হাজার ৪১১টি ঘটনায় অন্তত ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পাশাপাশি ১৯ জন অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তি রয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সমাবেশ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং স্থাপনা দখল এসব সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭০৪টি ঘটনায় ১২১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ১৩১ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার ২৩৬টি ঘটনায় ১৫৬ জন নিহত ও ২৪৯ জন আহত হন। এ ছাড়া ৩০০ জনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় শতাধিক রাজনৈতিক কার্যালয় এবং ১৩০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ১৫৫টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় ৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ঘটনায় পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ১৭ মাসে মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। এ সময় সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলার ঘটনায় ৬ জন নিহতসহ ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনে এই সময়ে ৬০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জন আসামির, যাদের মধ্যে ৪৪ জন কয়েদি ও ৮৩ জন হাজতি।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হন। এসব ঘটনায় ১৭টি মন্দির, ৬৩টি প্রতিমা এবং ৬৫টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে দেশজুড়ে শতাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে সীমান্ত পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, সীমান্তে ১১০টি ঘটনায় ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে হামলায় প্রাণ গেছে আরও ৩ জনের।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬ জন ধর্ষণের শিকার এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৪৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। শ্রমিক নির্যাতন ও কর্মস্থলের দুর্ঘটনায়ও শত শত শ্রমিক নিহত ও আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এইচআরএসএস মনে করছে, এসব তথ্য সামগ্রিকভাবে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয় এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।






































