
কয়েক বছরে চাঁদে পাঠানো হবে রোবোটিক ল্যান্ডার, লাফিয়ে চলতে সক্ষম ড্রোন এবং বিশেষ যানবাহন
চাঁদে স্থায়ী মানবঘাঁটি নির্মাণের লক্ষ্যে নতুন পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী কয়েক বছরে চাঁদে পাঠানো হবে রোবোটিক ল্যান্ডার, লাফিয়ে চলতে সক্ষম ড্রোন এবং বিশেষ যানবাহন।
এই প্রকল্পে অংশ নিতে নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্লু অরিজিন, ইনটুইটিভ মেশিনস এবং অ্যাস্ট্রোবোটিক। ব্লু অরিজিনের মালিক বিশ্বের অন্যতম ধনী উদ্যোক্তা জেফ বেজোস।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই, অর্থাৎ ২০২৯ সালের মধ্যে আবারও মানুষকে চাঁদে অবতরণ করানো।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনে নাসার সামনে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে চীন। চীনও ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটি তাদের শেনঝৌ-২৩ মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করে নভোচারীদের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে পাঠিয়েছে।
২০ বিলিয়ন ডলারের ‘মুন বেস’ প্রকল্প
গত মার্চে নাসা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য হলো ২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরু এলাকায় পারমাণবিক ও সৌরশক্তিচালিত স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, নতুন এই পরিকল্পনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ‘আর কখনো চাঁদ হারাবে না’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলতে পারলে সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানো, মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণ এবং ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহে যাত্রা আরও সহজ হবে।
তিন ধাপে এগোবে নাসার পরিকল্পনা
নাসার ‘ইগনিশন মুন বেস’ কর্মসূচি তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে মানুষ পাঠানোর আগে চাঁদের দুর্গম এলাকা অনুসন্ধান ও মানচিত্র তৈরির জন্য পাঠানো হবে রোবোটিক ল্যান্ডার ও বিশেষ ড্রোন। এছাড়া এমন যানবাহন পাঠানো হবে, যেগুলো ভবিষ্যতে নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে চলাচল এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বহনে সহায়তা করবে।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই রোবোটিক অনুসন্ধান চলবে। এ সময়ে ২৫টি উৎক্ষেপণের মাধ্যমে প্রায় ৪ মেট্রিক টন সরঞ্জাম চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কোন কোম্পানি কী বানাচ্ছে?
ব্লু অরিজিন তৈরি করছে ‘এন্ডিউরেন্স’ নামের একটি লুনার ল্যান্ডার। এটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অবতরণ করতে পারবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করবে।
অন্যদিকে অ্যাস্ট্রোবোটিকের ‘গ্রিফিন-১’ ল্যান্ডারকে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে অবস্থিত নোবিলে ক্রেটারে অবতরণের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এসব যানে থাকবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা এবং লেজারের প্রতিফলিত আলো ব্যবহার করে অবতরণে সহায়ক আধুনিক প্রযুক্তি।
চাঁদে বিদ্যুৎ ও বসবাসের পরিকল্পনা
পরবর্তী ধাপে নাসা চাঁদে সৌরবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। এর মধ্যে থাকবে ফিশন রিয়্যাক্টরও। ২০৩২ সালের মধ্যে নভোচারীদের জন্য ‘আধা-স্থায়ী’ আবাসন নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ রোভার যান নভোচারীদের দীর্ঘ দূরত্বে চলাচলে সহায়তা করবে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, কারণ সেখানে বরফ আকারে জমে থাকা পানির অস্তিত্ব রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই পানি ভবিষ্যতে পানীয় জল, অক্সিজেন এবং জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্পেসএক্সের বিলম্ব বড় চ্যালেঞ্জ
তবে পুরো পরিকল্পনার বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদে মানুষকে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার উপযোগী মহাকাশযান প্রস্তুত করা। স্পেসএক্স বর্তমানে ‘স্টারশিপ হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম’ তৈরি করছে। কিন্তু প্রকল্পটি একাধিক প্রযুক্তিগত জটিলতা ও বিলম্বের মুখে পড়েছে।
চন্দ্রবিজ্ঞানী সিমিওন বারবার বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো নভোচারীদের নিরাপদে চাঁদের পৃষ্ঠে নামানো।’
তার মতে, নাসার পরিকল্পনার পেছনে বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য যতটা আছে, রাজনৈতিক চাপও ততটাই কাজ করছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন মহাকাশ প্রতিযোগিতা এখন অনেকটাই মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।













































