cosmetics-ad

বাংলাদেশ বিমানে চড়ার নতুন অভিজ্ঞতা

biman-bangladesh

বেড়ানো বা অফিসের কাজে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সুবাদে বেশ কয়েকটা এয়ারলাইনস এর প্লেনে চড়ার সুযোগ হলেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে চড়া হয়নি আগে। তাই এবার ব্যাংকক ট্রিপে ভাবলাম দেখি ট্রাই করে। অফিসকে দিয়ে টিকেটও কাটিয়ে নিলাম। বাংলাদেশ বিমান এর ফ্লাইট এ যাবো। সবারই কেমন যেন একটু নাক সিটকানো ভঙ্গী- বি-মা-ন এ যাবা??? কেনো? আমি বলি হ্যাঁ- দেখি টেস্ট করে, কেমন হয়।

যাত্রার দিনে ফ্লাইট প্রায় আধা ঘন্টা লেইট। এখানে বলে রাখি আমার সর্বশেষ ভ্রমণ থাই এয়ার এর ফ্লাইট পাঁচ ঘন্টা দেরীতে ছেড়েছিল। সিড়ি বেয়ে প্লেন এর দরজায় পৌছাতেই সুন্দর একটা শাড়ি পড়া একজন এয়ার হোস্টেজ মিষ্টি হেসে বলল ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার’। জীবনে লক্ষ বার শোনা এই শব্দটা এখানে আবার শোনা মাত্রই প্লেন এর পরিবেশটা মুহুর্তেই আপন হয়ে গেলো। যাত্রীদের জন্য রাখা বাংলা খবরের কাগজ, মৃদু ভলিঊমে আমার পছন্দের বাংলা গানের মিউজিক, খুব সাধারণ চেহারা আর সাঁজপোশাকের কেবিন ক্রূদের আমার ভাষায় টুকটাক কথাবার্তা সব মিলিয়ে পুরোটাই দেশী আমেজ।

প্লেন এ চড়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশগামী বা এদেশ থেকে ছেড়ে যাওয়া বিদেশী এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইটগুলোতে এয়ার হোস্টেজরা কেমন যেন গোমড়া মুখ করে রাখে। যে মুহূর্তে ওদের বাংলাদেশ এ ডিউটি এসাইন করা হয়, ওদের মন খারাপ হয়ে যায় চাষাভুষা নোংরা আনকালচার্ড এক দল মানুষের সাথে নেক্সট কতগুলো ঘন্টা কাটাতে হবে, তাদের সেবা করতে হবে। আমাদের বাঙ্গালীপনায় তারা বেজায় বিরক্ত, বেশীরভাগ সময়ই তারা তাদের সুন্দর মুখগুলোকে বাংলা পাঁচ এর মত প্যাচ মেরে রাখে। দেশী কেবিন ক্রূদের নিয়ে আবার এই প্রবলেম নাই। তারা সবাই এই দেশী। দেশীয় কালচার তারা জানেন। বেশ হাসিমুখেই দেশী ভাইদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া, আবদার, অভিযোগ সামলানোর চেষ্টা করলেন। তবে সুন্দরী এয়ারহোস্টেজ কিংবা হ্যন্ডসাম কেবিন ক্রূদের দেখে ক্রাশ খাওয়া যাদের স্বভাব তারা কিছুটা হতাশই হবেন।

হালকা সবুজ রঙের উপর কারুকাজ করা সীটগুলো বেশ রুচিশীল, আরামদায়ক। সীট এর সামনে ফুল টাচস্ক্রীন এর টিভিটা বেশ চকচকে, ভালো রেজ্যুলেশনের। বাংলা ইংরেজী মেশানো গান, নাটক এবং মুভির বেশ ভালোই কালেকশন। রকস্টার মিলা, রুনা লায়লা অথবা সাংসদ মমতাজ সবার গানই পাবেন যার যার রুচিমত। হুমায়ূন আহমেদ এর নাম ভাঙ্গিয়ে বানানো কৃষ্ণপক্ষ মুভিটা দেখতে শুরু করছিলাম, বিরক্ত হয়ে বন্ধ করতে বাধ্য হলাম কিছুক্ষণ পরেই। বাকিটা সময় গান শুনেই দেখেই কাটিয়ে দিলাম।

received_10210908504058926

 

মাটি ছেড়ে ৩৭ হাজার ফিট উপরে উঠে প্লেন কিছুটা স্থির হতেই দিয়ে গেলো ছোট নোনতা বাদামের প্যাকেট আর জুস। তার কিছুক্ষণ পরেই খাবারের মেইন কোর্স। চিকেন বিরিয়ানি, সী-ফুড ফ্রাইড রাইস আর ভেজেটারিয়ান মিল। বেশ লম্বা রেঞ্জ এর অপশনস। সব ধরনের রুচির মানুষের কথা ভেবে মাত্র দুই ঘন্টার ফ্লাইটেই এই বিশাল আয়োজন। থাইল্যন্ড যাচ্ছি, সামনে কয়েকদিন সি ফুডের উপরেই থাকতে হবে এই ভেবে চিকেন বিরিয়ানি নিলাম। সাথে ব্রেড অ্যান্ড বাটার, পেপসি আর ডেসার্ট হিসাবে ছিল পুডিং সব মিলিয়ে সাত আট ধরণের খাবার। ভালোইতো।

খাবারের মাঝখানে কেবিন ক্রূদের একজন আসলেন হাতে একটি বড় বাটি নিয়ে “স্যার আচার নিবেন? আমের আচার? বিরিয়ানির সাথে খুব ভালো লাগবে”। মায়াভরা এই অফারে হা সুচক মাথা নাড়তেই চামচ দিয়ে কিছুটা আচার তুলে দিলো আমার প্লেটে। খাবার প্রায় শেষ, এমন সময় আরেকজন এলেন খাবারের প্যকেট আর চামচ হাতে। সীট থেকে সীটে ঘুরে ঘুরে বলতে লাগলেন “স্যার, এক্সট্রা খাবার লাগবে? আরেকটু দেই?”

শ’খানেক বার প্লেন এ ওঠার এক্সপেরিএন্স আমার, জীবনে কোনদিন এই ঘটনা ঘটে নাই, কোন ফ্লাইটেই এক্সট্রা খাবারের কথা কেউ বলেনাই, কিছুটা অভিভূতই হয়ে পরলাম।

সবই তো শুধু ভালো বললাম, খারাপ কি কিছুই ছিলনা? ছিল তো বটেই, কিছুটা আগোছালো, অপরিপাটি, কারো কারো কাছে কিছুটা অপরিষ্কার ও মনে হতে পারে। কেবিন ক্রূদের প্রফেশনালিজম নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। খুঁজলেতো হাজারটা দোষ বের করা যায়, কিন্তু একজন অর্ডিনারি বাঙ্গালীর চোখে বাঙ্গালী পরিবেশে এই ভুলভালগুলা খুব একটা বড় কিছু মনে হবেনা। কিছুটা এলোমেলো বলেই তো বাঙ্গালীপনা বিষয়টা এতটা আন্তরিক। পারফেকশান, সেটাতো ফিরিঙ্গীদের জিনিস।

খুব আফসোস হল বিমানের যাত্রী সংখ্যা দেখে। সীট প্রায় অর্ধেকই খালি। বিদেশী থাই বা ব্যাংকক এয়ারওয়েজ এর ফ্লাইটগুলোতে এরচেয়ে অনেক বেশী যাত্রী। এর চেয়ে দিগুণ মূল্যে টিকেট কিনে। দেশী প্রাইভেট এয়ারলাইনগুলোতে থাকে উপচেপড়া ভিড়, যদিও সেখানে সার্ভিসের কোন অংশে বেটার কিছুনা। বিমান এর নাম শুনলেই আমরা নাক সিটকাই, মনে করি এটাতে চড়লে হয়তোবা স্ট্যাটাস থাকবেনা। অথবা ধরেই নিই যে সার্ভিস ভালো হবেনা। হ্যাঁ, সার্ভিস এর মান হয়তো এখন ও পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানের হয়ে ওঠেনাই। কিন্তু আপনার চিরচেনা ভালোবাসার বাঙ্গালীপনার স্বাদ আর কোন ফ্লাইটে পাবেনা। কেউ আপনার পাতে আচার বা এক্সট্রা খাবার তুলে দিবেনা।

দেশ ছাড়ার জন্য এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন পার হবার পর থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে বার বার পেছনের দিকে তাকাই। যতবারই প্লেনে উঠি, অচেনা আতিথিয়েতায় নিজের পরিচিত জগৎটাকে মিস করি। অনেকেরই এমনটা হয় শিওর। দেশী বিমান এর ফ্লাইটে দেশের সীমানার বাইরে গিয়েও আরো কিছুটা সময় দেশী খাবার, বিনোদন আর আতিথিয়তায় ডুবে থাকার সুযোগ পেলে মন্দ কি? বিদেশ থেকে ফেরার সময়ও একই কথা।

আমরা তো কথায় কথায় দেশের জন্য জীবন দিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু যে কোন পণ্য বা সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের ফার্স্ট চয়েস থাকে বিদেশী প্রোডাক্ট। বিদেশী এয়ারলাইন্সের টিকেট কেটে দেশের কত কোটি কোটি টাকা বাইরে পাচার করে দিচ্ছি তা কি চিন্তা করি? একবার দেশী বিমানে চড়লে কিছুটা টাকা তো দেশের পকেটে যায়, কিছুটা লাভ হয় দেশের। আমাদের অভিযোগ সার্ভিস ভালো না। আরে ভাই, প্লেন এর অর্ধেক সীটই যদি খালে থাকে, তাহলে সার্ভিস ভালো করার টাকাটা আসবে কোত্থেকে শুনি? আমার সাথে সহযাত্রী অনেকেই আমার মত প্রথমবার এই ফ্লাইটে চড়েছেন, তারাও আমার মতই সন্তুষ্ট, অনেকেরই বক্তব্য “এমন সার্ভিস যদি দেয়, তাহলে তো রেগুলারই চড়া যায়” আমারও কিছুটা আফসোস হতে লাগলো আগে চড়িনি বলে। যাত্রী পেলে সার্ভিস অবশ্যই ভালো হবে, তার জন্য দরকার আমাদের একটু সাপোর্ট। ওই যে ছোটবেলায় পড়া কবিতাটার মত “আমরা যদি না জাগি মা ক্যামনে সকাল হবে?”

লেখক- তারেক আহমেদ, কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা।