cosmetics-ad

রাজস্বের অর্ধেকের বেশি আসে তিন অফিস থেকে

base_1481224668-2

রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের বার্ষিক আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি জোগান দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর আহরণ করে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারকে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সংস্থাটি। তবে এ রাজস্বের অর্ধেকের বেশি আসে দুই বৃহত্ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ও চট্টগ্রাম শুল্ক ভবন থেকে। যদিও রাজস্ব আহরণে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও কাস্টম হাউজসহ সারা দেশে ৬০টি কার্যালয় রয়েছে এনবিআরের।

গত অর্থবছর শুধু আয়কর ও মূসকের এলটিইউ ও চট্টগ্রাম শুল্ক ভবন থেকেই এসেছে ৭৬ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকার রাজস্ব, যা মোট রাজস্বের ৫০ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

অন্যদিকে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকেই আসে মোট রাজস্বের প্রায় ৯১ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরে সিটি করপোরেশন ও জেলা শহরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ এগোলেও রাজস্বচিত্রে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। গত অর্থবছরেও ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে এসেছে রাজস্বের বড় অংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্বের মধ্যে শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে এসেছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। মূলত বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ঢাকাকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা, বিভাগীয় ও জেলা শহরের অগ্রসরমাণ অর্থনীতি ও ব্যক্তিদের করের আওতায় না নিয়ে আসা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর অবকাশ সুবিধা দেয়ায় এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের কর উপদেষ্টা ও বাজেট বিশ্লেষক মঞ্জুর আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, এনবিআর সবসময়ই বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কর আদায় করে। বর্তমানে ঢাকার বাইরে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই কর অবকাশ সুবিধার আওতায়। জেলা শহরসহ গ্রামীণ অর্থনীতি এগোলেও তাদের প্রতি এনবিআরের দৃষ্টি কিছুটা কম। মূলত বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ও মানুষের ঢাকাকেন্দ্রিক কার্যক্রম না কমায় নির্দিষ্ট কিছু জায়গা থেকে বেশি রাজস্ব আহরণ করতে পারছে এনবিআর। করহার না বাড়িয়ে জেলা ও বিভাগীয় শহরে করের আওতা বাড়ালে ঢাকার বাইরে থেকে কর আহরণ বাড়বে।

এনবিআর জানিয়েছে, দেশ স্বাধীনের প্রথম দিকে প্রত্যক্ষ কর বা মানুষের আয়ের ওপর নির্ধারিত আয়করই সরকারের রাজস্ব আহরণের একমাত্র মাধ্যম ছিল। পরবর্তীতে আমদানি-রফতানি পর্যায়ে শুল্ক থেকে রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে পরোক্ষ কর ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে পরোক্ষ করে মূসক যোগ হওয়ায় রাজস্ব আহরণে নতুন দিক উন্মোচন হয়। বর্তমানে প্রত্যক্ষ করের বাইরে আমদানি-রফতানি পর্যায়ে শুল্ক, মূসক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক এবং স্থানীয় পর্যায়ে উত্পাদন ও সেবাপর্যায়ে মূসক, আবগারি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও টার্নওভার করই সরকারের রাজস্ব আহরণের মূল উত্স। এসব খাতে রাজস্ব আহরণে আয়করে এলটিইউসহ ৩১টি কর অঞ্চল, মূসকে এলটিইউসহ ১২টি কমিশনারেট ও শুল্কে ১৭টিসহ সারা দেশে ৬০টি কার্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়কর বিভাগে ঢাকা-চট্টগ্রামের ২১টি কার্যালয় মোট আয়করের ৯২ শতাংশ ও এলটিইউ এককভাবে ২৭ দশমিক ৭২ শতাংশের জোগান দিয়েছে। মূসক বিভাগে এলটিইউসহ ঢাকা-চট্টগ্রামের ছয়টি কার্যালয় মোট ভ্যাটের ৮৭ দশমিক ৩৯ ও এককভাবে এলটিইউ ৫৪ দশমিক ২৪ শতাংশ রাজস্বের জোগান দিয়েছে। এর বাইরে আমদানি-রফতানি পর্যায়ে প্রাপ্ত রাজস্বের ৬৯ দশমিক ২৫ শতাংশ এসেছে চট্টগ্রাম শুল্ক ভবন থেকে। আর ঢাকা-চট্টগ্রামের আটটি কার্যালয় মিলে এসেছে মোট শুল্ক আয়ের ৮৩ দশমিক ২ শতাংশ।

এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. নজিবুর রহমান বলেন, দেশের সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানই ঢাকা-চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হওয়ায় এখান থেকেই সরকারের বেশি রাজস্ব আসে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে রাজস্বের বড় অংশই তাদের মাধ্যমে আহরণ হয়। এনবিআর বদলে যাওয়ায় জনগণ কর দিতে এগিয়ে এসেছে। পরিবেশ যত ভালো হবে, ধীরে ধীরে করদাতার সংখ্যা তত বাড়বে। এনবিআর সব জায়গায় পরিবেশ উন্নতির জন্য কাজ করছে। ফলে দেশের সর্বত্রই রাজস্বের পরিমাণ বাড়বে।

এনবিআরের তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়কর থেকে ৫৪ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করে এনবিআর। এর মধ্যে ঢাকার এলটিইউ থেকে এসেছে ১৪ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা মোট আয়করের ২৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। এছাড়া ঢাকার কর অঞ্চল-১ থেকে ৭ হাজার ৪৬১ কোটি, কর অঞ্চল-২ থেকে ৮ হাজার ৪৭৫ কোটি, কর অঞ্চল-৪ থেকে ২ হাজার ৪০১ কোটি, কর অঞ্চল-৩ থেকে ৬৫০ কোটি, কর অঞ্চল-৫ থেকে ৭৬০ কোটি, কর অঞ্চল-৮ থেকে ৯৮১ কোটি, কর অঞ্চল-১২ থেকে ১ হাজার ২৫৫ কোটি, কেন্দ্রীয় জরিপ অঞ্চল থেকে ১ হাজার ১ হাজার ১২৯ কোটি এবং কর অঞ্চল চট্টগ্রাম-১ থেকে ৩ হাজার ১৮৫ কোটি ও কর অঞ্চল-৩ থেকে ১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা আদায় হয়েছে।

গত অর্থবছর এনবিআরের সর্বোচ্চ রাজস্ব আসে মূসক থেকে। এর পরিমাণ ৫৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকার শুধু এলটিইউ থেকেই ৩০ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা বা ৫৪ দশমিক ২৪ শতাংশ রাজস্ব আসে। এর বাইরে চট্টগ্রাম কমিশনারেট থেকে ৫ হাজার ১৩২ কোটি, ঢাকা দক্ষিণ কমিশনারেট থেকে ৭ হাজার ৪৮৭ কোটি, ঢাকা উত্তর থেকে ৩ হাজার ৬৭২ কোটি, ঢাকা পশ্চিম থেকে ১ হাজার ৩২৭ কোটি ও ঢাকা পূর্ব কমিশনারেট থেকে ১ হাজার ১৬১ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহ করেছে এনবিআর।

এনবিআরের রাজস্ব আহরণের তৃতীয় খাত শুল্ক থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৫ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম শুল্ক ভবন থেকেই এসেছে ৩১ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা, যা মোট শুল্কের ৬৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর বাইরে ঢাকা শুল্ক ভবন থেকে ২ হাজার ৮৫৬ কোটি, আইসিডি কমলাপুর শুল্ক স্টেশন থেকে ১ হাজার ৫৮২ কোটি, বন্ড কমিশনারেট ঢাকা থেকে ১ হাজার ২২৯ কোটি, বেনাপোল শুল্ক ভবন থেকে ২ হাজার ৯৩২ কোটি ও মংলা শুল্ক ভবন থেকে ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকার রাজস্ব এসেছে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে রাজস্বের বড় অংশ আসবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঢাকায়ই অবস্থিত। কিছু প্রতিষ্ঠান ঢাকার বাইরে থাকলেও তাদের অধিকাংশই প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হওয়ায় এখানেই কর দিয়ে থাকেন। বড় শিল্পপতিদের কেউ কেউ ঢাকার বাইরে আয় করলেও ঢাকায়ই কর পরিশোধ করেন। ফলে ঢাকা থেকে রাজস্ব সবচেয়ে বেশি আসে। তবে মূসকের নতুন আইন হলে ঢাকার বাইরে থেকে রাজস্ব আয় বর্তমান অবস্থার তুলনায় বাড়বে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে করমেলাসহ সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়ালে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।