
হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত
মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে গত দুই সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী গত অর্থবছরে এই অঞ্চলের আটটি দেশে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই বিশাল অংকের পণ্য রপ্তানি করেছে প্রায় ১ হাজার ৮২৩টি প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে ৫৮০টি প্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান উৎসই এই বাজারটি।
মূলত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ায় এই স্থবিরতা তৈরি হয়। সমুদ্রপথে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের মতো বড় বাজারগুলোতে পণ্য পাঠানো প্রায় বন্ধ রয়েছে।
রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন বাংলাদেশের অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে অভিজ্ঞতা অর্জন করে পরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করেন। গত বছর ভারতের বিধিনিষেধের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এই নতুন সংকট তাদের জন্য চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বর্তমানে সমুদ্রপথে প্রায় ৮১ শতাংশ পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে আকাশপথ ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। তবে আকাশপথে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। আগে বিমানে প্রতি কেজি পণ্য পাঠাতে ১০৭ টাকা লাগলেও এখন খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকা। একইভাবে সমুদ্রপথে প্রতি কনটেইনারের ভাড়া ২ হাজার ২০০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে।
রপ্তানি হওয়া পণ্যের তালিকায় পাটজাত পণ্য, বিস্কুট, পানীয়, সবজি ও তৈরি পোশাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো রয়েছে। বিস্কুট ও মসলা খাতের অনেক ছোট কারখানায় ইতিমধ্যে উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে অস্থায়ী কর্মীদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। সবজি ও পানপাতা রপ্তানিকারকরা বিমান ভাড়া বাড়ার কারণে কার্যাদেশ থাকা সত্ত্বেও লোকসানের আশঙ্কায় পণ্য পাঠাতে পারছেন না। পাটজাত পণ্য ও তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও জাহাজ ভাড়া তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায় নতুন শিপমেন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
ঢাকার জোয়ার সাহারা এলাকার ইউনিভার্সাল অ্যাপারেলসের মতো ছোট কারখানাও এখন বিপাকে। প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানির পুরোটাই সৌদি আরবে হওয়ায় আগামী মাসের শিপমেন্ট নিয়ে তারা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। একই অবস্থা চট্টগ্রামের প্যাসিফিক সি ফুডস বা খুলনার কোয়ালিটি জুট ইয়ার্নের মতো বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। জাহাজ ভাড়া বাড়ার কারণে কার্পেটের সুতা থেকে শুরু করে হিমায়িত মাছ—সব ধরনের পণ্যই এখন গুদামে আটকা পড়ে আছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য একটি দ্রুত বর্ধনশীল এবং উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় বাজার ছিল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষকরা বলছেন এই সংঘাত দ্রুত শেষ না হলে বাজার সম্প্রসারণের এই প্রক্রিয়া বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে। এখন কেবল সংঘাত থামার অপেক্ষা ছাড়া রপ্তানিকারকদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। যদি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হয় তবে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।









































