মঙ্গলবার । এপ্রিল ১৪, ২০২৬
মাহবুব কিংশুক আন্তর্জাতিক ১৬ মার্চ ২০২৬, ৬:০৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

এক্সপ্লেইনার

ইরান যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে কারা?


Iran war

এই সংঘাতের পর বিশ্ব হয়তো আরও বিশৃঙ্খল ও বহুমেরু হয়ে উঠবে

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান ক্রমেই বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর সবচেয়ে বড় চাপগুলোর একটি হয়ে উঠছে এবং এটি অনেকের কাছে ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেটিকে ‘ছোট একটি অভিযান’ বলে উল্লেখ করেছেন, তা এখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করছে। পূর্ব এশিয়া থেকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা সহায়তা চাইলে তাতে সাড়া দিতে বিলম্ব হচ্ছে, এমনকি রোমানিয়ার একটি বিমানঘাঁটিও এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক ইতিহাসের অধ্যাপক পিটার ফ্রাঙ্কোপান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে যার পরিণতি নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা করা হয়নি। এতে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

যুদ্ধের চিত্র ও ইরানের প্রতিরোধ
যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইতোমধ্যে প্রায় ৬,০০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।

তবে প্রত্যাশা করা হলেও ইরানের সরকার এখনো ভেঙে পড়েনি। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকেও বিদ্রোহে উসকে দেওয়ার মার্কিন চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলি লারিজানি সম্প্রতি তেহরানের রাস্তায় জনতার মধ্যে উপস্থিত হয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন, যদিও শহরটিতে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।

ইরান একই সঙ্গে সস্তা শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে দোহা, মানামা ও দুবাইয়ের মতো শহরগুলোতে চাপ সৃষ্টি করছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।

ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে অন্তত ছয়টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।

‘সুয়েজ মুহূর্ত’?
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গারগেস মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘সুয়েজ সংকটের মতো একটি মুহূর্ত’।

১৯৫৬ সালে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল মিলে মিসরের সুয়েজ খাল দখলের চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেই অভিযান থামাতে বাধ্য করেছিল। ইতিহাসে এটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় কোনো শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে থামাবে—এমন সম্ভাবনা আপাতত নেই। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী রাশিয়া ইরানের হামলায় সহায়তা করছে এবং চীন তেহরানকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন হিসাব
উপসাগরীয় দেশগুলো বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিকে নিজেদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে দেখেছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন ও কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি স্থাপন করা হয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের পর কিছু দেশ এখন সেই নির্ভরতার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকার কারণে তারাও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।

ফলে বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করেছে অনেক দেশ। সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এবং তুরস্কের সঙ্গে যৌথ অস্ত্র উৎপাদনের আলোচনা চালাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত চীনা সামরিক উপস্থিতিও অনুমোদন দিয়েছে।

পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপেও প্রভাব
ইরান যুদ্ধের কারণে পূর্ব এশিয়াও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া থেকে একটি থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার হুমকির প্রেক্ষাপটে।

অন্যদিকে ইউরোপেও এর প্রভাব পড়ছে। জার্মানি, তুরস্ক, রোমানিয়া ও গ্রিসে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথাও বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র, কারণ জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালী ও ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা
বিশ্বের একটি পরাশক্তি হিসেবে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার অন্যতম প্রতীক। কিন্তু বর্তমানে হরমুজ প্রণালী খুলতে না পারা অনেকের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে ফ্রান্স ও ইতালি তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে সরাসরি ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ভারতও একই পথে এগিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের পর বিশ্ব আরও জটিল ও বহুমেরু শক্তির ভারসাম্যের দিকে এগোতে পারে।

গারগেসের ভাষায়, “এই সংঘাতের পর বিশ্ব হয়তো আরও বিশৃঙ্খল ও বহুমেরু হয়ে উঠবে।”