মঙ্গলবার । মার্চ ১০, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ১০ মার্চ ২০২৬, ৪:২৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

একনজরে ইরান যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার ১১তম দিনে কী কী ঘটছে


US Israel attack on Iran

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার ১১তম দিনে কী কী ঘটছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো সামরিক অভিযানের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। রাতভর তেহরানে “সবচেয়ে তীব্র বোমাবর্ষণের” একটি পর্ব ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার বলেছেন, যুদ্ধ ‘খুব দ্রুতই শেষ হতে পারে’, তবে তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতি অসন্তোষও প্রকাশ করেন।

এদিকে রাজধানী তেহরানে লাখো মানুষ সমাবেশ করে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জানান। তিনি সম্প্রতি তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।

ইরানে পরিস্থিতি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মঙ্গলবার জানিয়েছেন, প্রয়োজন যতদিনই হোক, ততদিন পর্যন্ত ইরান লড়াই চালিয়ে যাবে। এতে ট্রাম্পের ‘শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হবে’ মন্তব্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ইরানের আইএসএনএ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, পশ্চিম ইরানের আরাক শহরে একটি আবাসিক ভবনে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।

নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণের মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ তেহরানে সমাবেশ করে নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। সমর্থকদের মতে, এটি ইরানের ওপর হামলাকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে দেশটিকে বিভক্ত করা এবং তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।

উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি জানিয়েছেন, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

পূর্ব তেহরানের আবাসিক এলাকায় এক হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া তেল স্থাপনায় হামলার কারণে রাজধানীর আকাশে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত যুদ্ধে ১,২৫৫ জন নিহত এবং প্রায় ১০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আবাসিক এলাকায় হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ট্রাম্প আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নজর রাখছে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কোনো “স্লিপার সেল” সক্রিয় করেছে কি না।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে উত্তেজনা
কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও বাহরাইন জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, আল-খারজ অঞ্চলের পূর্বদিকে একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। অন্যদিকে রিয়াদ প্রদেশের আজ-জুলফি শহরে একটি ড্রোন পড়ে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে কেউ আহত হয়নি।

বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি আবাসিক ভবনে হামলায় ২৯ বছর বয়সী এক নারী নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। দেশটির আকাশসীমা বন্ধ থাকায় গালফ এয়ারের সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে।

কুয়েত জানিয়েছে, মঙ্গলবার ছয়টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, তার দেশ মধ্যপ্রাচ্যে একটি সামরিক নজরদারি বিমান পাঠাবে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে, তবে স্থলবাহিনী পাঠাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানে ৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তার দাবি, এতে ইরানের নৌ ও বিমানবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের ৮০–৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ইরানের ড্রোন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হামলা চলছে।

তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও “চূড়ান্ত বিজয়” অর্জনের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম একজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।

এদিকে ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সোমবার ফোনে ইরান যুদ্ধ ও ইউক্রেন শান্তি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। পুতিন সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ইসরায়েলে হামলা
ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা হাইফা শহরের একটি তেল ও গ্যাস শোধনাগার এবং জ্বালানি ট্যাংক লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে।

তেল আবিবের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি নির্মাণস্থলে শেল বা ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এতে ইরানের হামলায় ইসরায়েলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে।

লেবানন, ইরাক ও তুরস্কে প্রভাব
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী শিয়া আল-সুদানি যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছেন, ইরাকের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরাকের কুর্দিস্তানের এরবিলে হারির মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের আবারও এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। লিতানি নদীর দক্ষিণে বসবাসকারীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, সেখানে ব্যাপক বিমান হামলা চলছে।

লেবাননে চলমান হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৮৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

এদিকে সীমান্তের কাছের খ্রিস্টান অধ্যুষিত ক্বালায়া গ্রামে ইসরায়েলি ট্যাংকের গুলিতে মারোনাইট ক্যাথলিক পুরোহিত পিয়েরে আল-রাহি নিহত হয়েছেন।

তুরস্ক জানিয়েছে, ন্যাটোর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুর্কি আকাশসীমায় ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।

জ্বালানি বাজারে প্রভাব
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে আবারও কাজ করতে প্রস্তুত রাশিয়া।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, তার দেশ ও মিত্ররা হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার একটি মিশন প্রস্তুত করছে।

ইরানের তেল স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জি–৭ অর্থমন্ত্রীদের জ্বালানি মজুত ছাড়ার প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করেছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ক্রুড অয়েলের দাম এক সময় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে উঠলেও পরে তা প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে।