কাতার আমীরের প্রাসাদে বাংলাদেশি খতিব

saiful‘অবশেষে কাতার আমীরের প্রাসাদে খতিব নিযুক্ত হলাম’ এ শিরোনামে কাতার থেকে ক’দিন আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন হাফেজ মাওলানা সাইফুল ইসলাম। এতে লাইক পড়ে প্রায় দুই হাজার, শেয়ার হয় পাঁচ শতাধিক! সামাজিক মাধ্যমে এমন সংবাদ দেখে একটু অবাকই হলাম। বাংলাদেশি ছেলে কাতার আমীরের প্রাসাদের খতিব! সঙ্গে সঙ্গে ইনবক্সে নক করলাম, আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। জবাব এলো, এক সপ্তাহ পর দেশে আসছি, দেখা হবে কথাও হবে।

সপ্তাহান্তে: দেখা হল হাফেজ মাওলানা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। কথায় কথায় জানলাম খতিব হয়ে তার কাতার আমীরের প্রাসাদে যাওয়ার আদ্যোপান্ত। বললেন- একটা বদনাম প্রচলিত আছে, ভালো হাফেজ কখনও ভালো আলেম হন না! আমার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাদৈর থেকে প্রাইমারি শেষ করে যখন মাদ্রাসায় ভর্তি হই, ওস্তাদজি বলেছিলেন- শুধু কোরআন পড়া নয় বুঝারও যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তখন থেকেই মনের গহীনে গেঁথে নিয়েছিলাম হুজুরের এ উপদেশবাণী। হিফজ শেষ করি ওস্তাযুল হুফফাজ শায়খ আবদুল হকের কাছে। এরপর ভর্তি হই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া দারুল আরকামে। সেখানে আরবি শেখার ভালো একটা পরিবেশ পেয়ে যাই। আরবরা কীভাবে কথা বলে, কোন স্টাইলে বক্তৃতা করে, কোরআন তেলাওয়াতের তাদের ধরন কী- এগুলো তখন থেকেই ফলো করতে শুরু করি। পাশাপাশি কোথাও আরবিবিষয়ক কোনো প্রতিযোগিতা হলেই অংশ নিতাম। প্রতিযোগিতাগুলো আমার জন্য অনেক সহায়ক হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, জীবনে অনেক পুরস্কার আমার ভাগ্যে জুটেছে।

কাতার গেলাম যেভাবে: ২০০৪ সালে আমি দুবাই হলি কোরআন অ্যাওয়ার্ডে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি। সেখানেই পরিচয় হয় কাতার রাজপরিবারের সদস্য আবদুল আজিজ বিন খালেদ আবদুল্লাহ আল-সানির সঙ্গে। তিনি আমন্ত্রণ জানান কাতার ভ্রমণের। ওই বছরই রমজানের আগে আবদুল্লাহ আল-সানি তার দেশে তারাবিহর নামাজ পড়ানোর প্রস্তাব দেন। আমি রাজি হয়ে যাই। এরপর থেকে প্রতি বছরই রমজান এলে আমার ডাক পড়ত সেখানে। বিশ দিনে খতম শেষ করে সানি আমাকেসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে চলে যেতেন উমরায়। উমরাহ শেষে ফিরে আসতাম দেশে।

সাইফুলের পড়াশোনা: পড়াশোনা সম্পর্কে সাইফুলের কাছে জানতে চাইলে বলেন- দারুল আরকাম মাদ্রাসায় ছাত্র অবস্থার এক ফাঁকে দাখিল পরীক্ষা দিই। দাওরায়ে হাদিস শেষ করি ২০১১ সালে। ২০১২ সালে দিই আলিম পরীক্ষা। আমার চূড়ান্ত ইচ্ছা ছিল কাতার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া। এ জন্যই দাখিল ও আলিম পরীক্ষা দেয়া। আল্লাহতায়ালা আমাকে হতাশ করেননি; চেষ্টায় সফল হয়েছি। স্কলারশিপসহ কাতারে চান্স পেয়ে যাই ২০১২ সালেই। চলতি বছর সেখান থেকে ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স সম্পন্ন করি। আফসোস, যে কওমি মাদ্রাসায় পড়ে এতটা যোগ্যতা অর্জন করেছি, সেগুলো কোথাও দেখাতে পারি না সরকারি অনুমোদন না থাকার কারণে।

প্রথম খতিব সেনাবাহিনীর মসজিদে: ২০১৫ সাল ছিল আমার ইউনিভার্সিটি জীবনের তৃতীয় বর্ষ। এ সময় একটা বিজ্ঞাপনে দেখলাম, কাতারের সবচেয়ে অভিজাত এলাকা দাফনার রমিলা সেনা অফিসারদের ২০৭ নম্বর মসজিদে খতিব নিয়োগের ইন্টারভিউ হবে। বিষয়টি মোটেও সহজ ছিল না। অনেকে নিরুৎসাহিত করেছেন বিদেশি হওয়ার কারণে। তাদের নিরুৎসাহ আমার ভেতরে জিদ চাপিয়ে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে ধরলাম- ইন্টারভিউ আমাকে দিতেই হবে। রাতদিন চেষ্টা করেছি, খুতবাটা কীভাবে আকর্ষণীয় করা যায়। করেছিও তাই। অবশেষে আল্লাহর মেহেরবানিতে স্বপ্ন এসে হাতের মুঠোয় ধরা দিল। ইন্টারভিউর ফলাফলে আমার নাম সবার শীর্ষে স্থান পেয়েছে!

স্বপ্নের মতো আমীরের প্রাসাদে: আমার ঘোর কাটে না, সাইফুল বলেই চলছেন- এক বছরের বেশি সময় সেনাবাহিনী মসজিদে ধারাবাহিক খুতবা দিই। গত রমজানের শেষ দিকে হঠাৎ আমার মোবাইলে কল আসে, আমি তখন ড্রাইভিংয়ে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলা হল- কাসরুল আমীরে (আমীরের প্রাসাদ) তোমাকে কাল খুতবা দিতে হবে। সেখানে কাতার আমীর, তার বন্ধুবান্ধব ও রাজপরিবারের লোকজন নামাজ পড়বেন। ভালোভাবে প্রস্তুতি নাও। ফোনটা পাওয়ার পর আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম, কেউ আমার সঙ্গে দুষ্টামি করছে না তো! তাকে বললাম- আমি তো এক জায়গায় খুতবা দিই। তিনি আমাকে মৃদু একটা ধমক দিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার নাম করে বললেন- নাম্বার টেক্সট করছি, এখনই তার সঙ্গে যোগাযোগ করো। গাড়িটি এক পাশে রেখে বিমূঢ়ের মতো বসে রইলাম। এর মধ্যেই ওই নম্বর থেকে ফোন। বলা হল- গুগল ম্যাপ থেকে তোমার বাসার ঠিকানার একটা স্ক্রিনশট পাঠাও। কাল এতটার সময় তোমাকে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রস্তুত থেক। সেই শুরু। এখন প্রতি জুমার দুই ঘণ্টা আগে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় আমীরের প্রাসাদে খুতবা দেয়ার জন্য। মূলত সেনাবাহিনী মসজিদে খুতবা দিয়েই আমি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

তার যত অর্জন: সাইফুল ইসলাম দেশ-বিদেশে অনেক পুরস্কার জিতেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ২০০৪ সালে দুবাই আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান, একই বছর সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় চতুর্থ স্থান, ২০০৫ সালে জর্ডানে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান, ইরান আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় চতুর্থ স্থান ২০০৯ সালে এবং পরের বছর জর্ডানে আন্তর্জাতিক তাফসিরুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান। সব প্রতিযোগিতায়ই সত্তরের অধিক দেশের প্রতিযোগী অংশ নিয়েছিল।

স্বপ্ন এখন আকাশছোঁয়ার: মাওলানা সাইফুল শুধু নিজের ক্যারিয়ার নিয়েই ব্যস্ত থাকছেন না, বরং আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, বাংলাদেশের প্রতিটা অঞ্চলেই যেন তার মতো আরও অসংখ্য সাইফুল তৈরি হয়, যারা বহির্বিশ্বে নিজেদের অনন্য মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে দীপ্তিময় করে তুলবে।

এ লক্ষ্যে তিনি মারকাজুত তানজিল নামে একটি ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা চালু করেছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে। আন্তর্জাতিক মানের তিনজন শিক্ষকের সার্বক্ষণিক তদারকির পাশাপাশি সাইফুল নিজেও স্কাইপি প্রজেক্টরের মাধ্যমে কাতার থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেন। সাইফুলের স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ুক- এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক: এহসান সিরাজ