আনিসুল হকের নিরব দক্ষিণ কোরিয়া সফর

editorialঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক আর আমাদের মাঝে নেই। রাজনৈতিক কথার ফুলঝুরি নিয়ে রাজনীতি করার মাঠে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ মেয়র আনিসুল হক। নগর নিয়ে তার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন শুরুর পর ঢাকা শহরের অনেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তার কাছ থেকে রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক কোন কথাও শুনিনি। আনিসুল হককে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় সফর করেছিলেন আনিসুল হক। সেই সফর নিয়ে দুটি কথা বলার জন্য আজকের এই লেখা।

গত বছরের এপ্রিলে আনিসুল হক কোরিয়া এসেছিলেন। কোরিয়ার আইসিটি মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং কোম্পানীর সাথে মিটিং করেছিলেন। বেশ কয়েকটি চুক্তিও সম্পাদন করেছিলেন। এই সংবাদ পেয়েছিলাম কোরিয়ান ভাষায় প্রকাশিত কোরিয়ান পত্রিকার মাধ্যমে। আমার জানামতে, সেসময় বাংলাদেশের কোন পত্রিকায় সেই সংবাদ ছাপানো হয়নি। প্রধান প্রধান সংবাদ মাধ্যমে এবং গুগলে সার্চ করেও কোন তথ্য পাইনি। কোরিয়াতে কোন ভিআইপি আসলে সাধারণত কোরিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের ফেসবুকেও দেখা যায়। দূতাবাস ভিআইপিদের জন্য ভোজের আয়োজনও করে থাকে। সেসময় মেয়র আনিসুল হকের সফর নিয়ে এইরকম কোন কিছুই দেখা যায় নি। তার এই নিরব সফর আমার কাছে ব্যতিক্রমই মনে হয়েছে।

মেয়র এই সফরের আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সাথে ঢাকা সিটির উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা এবং চুক্তি আমার কাছে স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। কিন্তু অবাক লেগেছিলো দক্ষিণ কোরিয়ার ছোট একটি শহর আনিয়াং সিটির সাথে আলোচনা নিয়ে। ঢাকা শহরের ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম আপগ্রেড করার জন্য তিনি আনিয়াং সিটির সাথে আলোচনা করেছিলেন। সিউল সিটি, ইনছন বা বড় কোন শহর বাদ দিয়ে আনিয়াং কেন? পরে কোরিয়ান বিভিন্ন পোর্টাল ঘেটে যা পেলাম তা হলো আনিয়াং সিটির ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাপনা কোরিয়ার অন্যতম সেরা। আনিয়াং সিটির ‘ইন্টিলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম’ ২০১৫ সালে কোরিয়ার ট্রান্সপোর্ট বিভাগে সেরা ইনোভেশনের পুরস্কার পেয়েছে। অন্যান্য শহর ইতিমধ্যে তাদের সিস্টেম অনুসরণ করছে। এই সিস্টেম নিয়ে আমার খুব বেশি ধারণা না থাকলেও ইন্টারনেট ঘেটে যতটুকু বুঝলাম সড়ক ব্যবস্থাপনার জন্য এই সিস্টেম খুবই যুগোপযোগী। সড়ক সংস্কার করার সময় ইন্টিলিজেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করে কাজ সম্পন্ন করা , নাগরিকদের সমস্যা না হওয়ার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা, খরচ কমানো ইত্যাদি এই সিস্টেমের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

সেসময়কার আনিয়াং সিটি থেকে প্রকাশিত অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী, আনিসুল হক ‘ইন্টিলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম’ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আগেই জেনে এসেছিলেন। কোরিয়াতে এসে তিনি এই সিস্টেম ঢাকাতে কিভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে আনিয়াং এর কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেন এবং সিটির মেয়রের সাথেও আলাদা মিটিং করে এই ব্যাপারে আলোচনা করেন। ঢাকা শহর নিয়ে আনিসুল হকের প্রচেষ্টার একট ছোট ঘটনার বর্ণনা দিলাম।

তবে আমার কাছে ব্যতিক্রম মনে হয়েছে তার এই ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই সফর পত্রপত্রিকায় না আসা। আমাদের রাজনীতিবিদরা যতটা না কাজ করেন তার চেয়ে কৃতিত্ব নিতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। ছবি তোলা, ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য ব্যস্ত থাকেন। আনিসুল হক তা থেকে ব্যতিক্রম। তিনি যে কথা নয়, কাজের মানুষ তা তার নিরব কোরিয়া সফরের মাধ্যমেই বুঝছিলাম।

প্রিয় ঢাকা শহরের জন্য উনাকে খুব দরকার ছিল। অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই তার জন্য খুব খারাপ লেগেছিল। পত্রপত্রিকায় চোখ রেখেছিলাম। মৃত্যুর খবর অন্য সবার মত আমাকেও ব্যতিত করেছিল। আল্লাহ যেন বেহেস্ত নসিব করেন সেই দোয়া করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।

সরওয়ার কামাল, সম্পাদক, বাংলা টেলিগ্রাফ।