আমিরাতে বিদেশি ধান্দাবাজ!

habib
লেখক

তখন আমি আরব আমিরাতের শারজায় থাকি। এক সন্ধ্যায় শারজার বাংলা বাজার থেকে এক প্যাকেট হিমায়িত কাচকি মাছ আর আধা কেজি কাঁচা মরিচ কিনে ঘরে ফিরছিলাম।

রাতে কাঁচা মরিচ দিয়ে কাচকি মাছের চচ্চড়ি রান্না করবো। খেতে কী মজা হবে- এই কল্পনা করে বাজারের থলে হাতে ঘরে ফিরছিলাম। পথিমধ্যে এক লোকের সালামে আমার এমন মধুর কল্পনায় বিঘ্ন ঘটে।

আমি সালামের জবাব দিতেই ভদ্রলোক উর্দুতে জিজ্ঞেস করলেন- “কী অবস্থা? আপনি কোথাকার?” জবাবে আমি বললাম, “অবস্থা ভালো। আপনি কে? আপনাকে তো চিনলাম না।”

উর্দুতে আমাদের কথাবার্তা চললো। লোকটি বললো, আমি পাকিস্তানি, থাকি ওমানে। পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে এসেছি। টাকাসহ মানিব্যাগটি হারিয়ে ফেলেছি। দয়া করে একটু সাহায্য করুন, এই বলে গাড়িতে থাকা বিবি-বাচ্চাকে দেখালেন। আমিও উঁকি দিয়ে তাই দেখলাম।

বছরখানেক হলো আমাদের কোম্পানি বেতনের টাকা ব্যাংক মারফত আদায় করে। ব্যাংক থেকে কার্ড পেয়েছি। কার্ড মেরে প্রয়োজন অনুযায়ী মেশিন থেকে টাকা উঠিয়ে নেই। কেনাকাটা করে কার্ডের মাধ্যমেও পেমেন্ট করা যায়। সাথে নগদ টাকা রাখার তেমন একটা দরকার হয়না।

আমি বললাম, “দুঃখিত, কেনাকাটা করে সব টাকা-পয়সা খরচ করে ফেলেছি, আশা করি আপনি বিপদমুক্ত হবেন। কেউ একজন নিশ্চয়ই আপনাকে সাহায্য করবে।” পরে আমি রুমে চলে আসি। রুমে ফিরে আমার আর কাচকি মাছে মন বসলো না। বিপদগ্রস্ত লোকটাকে সাহায্য করতে না পারায় মনটা কেমন করছিলো। হিমায়িত কাচকি মাছ আবার ফ্রিজের হিমায়িত কোঠায় রেখে দিয়ে আমি ফিরে গেলাম লোকটিকে সাহায্য করতে।

যেতে যেতে পথিমধ্যে এটিএম বুথ থেকে দুইশ দিরহাম বের করলাম। ভাবলাম, একশ’ দিরহাম দিয়ে লোকটা বিবি-বাচ্চা নিয়ে রাতের খাবার সেরে নিতে পারবে। আর বাকি একশ’ দিরহাম নিজের খরচের জন্য রেখে দেবো।

যে জায়গায় লোকটির সাথে দেখা হয়েছিল, সেখানে গিয়ে আর লোকটিকে পেলাম না। গাড়িটিও সেখানে নেই। লোকটি বলেছিলো, গাড়ির তেলও
ফুরিয়ে আসছে। টাকা হারিয়ে যাওয়ায় তেল ভরতে পারেনি, তাই ওমান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না। যেহেতু গাড়ির তেল ফুরিয়ে আসছে, সেহেতু বেশিদূর যেতে পারবে না- এই ভেবে আমি লোকটাকে খুঁজতে থাকলাম।

অনেক রাত পর্যন্ত অর্ধেক শহরজুড়ে খোঁজাখুঁজি করে লোকটাকে না পেয়ে ভারাক্রান্ত মনে রুমে ফিরে আসি। পরদিন ইমাম সাহেবকে ব্যাপারটা খুলে বলি। ক’দিন ধরে ইমাম সাহেবের বাসার ফ্রিজ কুলিং হয় না। তাই আমার বাসায় আসেন মাছ-সবজি রাখতে। ইমাম সাহেব মুখে হাসি চেপে পুরো ব্যাপারটি শুনলেন। তারপর বললেন- “এটা কোনো নতুন খবর নয়। আজকাল এসব একটা ধান্দা।” ইমাম সাহেব আমাকে এই ধান্দার একটি বর্ণনাও দিলেন।

বললেন, সারাদিন ঘুরেফিরে বউ-বাচ্চার দোহাই দিয়ে যদি এরা দৈনিক একশ’ দিরহাম আয় করতে পারে, তাহলে মাসে হবে তিন হাজার দিরহাম। টাকায় রূপান্তরিত করলে যা ৬০ হাজার টাকারও উপরে। যা দিয়ে বউ-বাচ্চা নিয়ে আরাম-আয়েশেই কাটবে মাস। সাথে বউ-বাচ্চা ও গাড়ি থাকাতে মানুষ খুব সহজে এদের বিশ্বাস করে ফেলে।

আমি বললাম, এতো ধান্দা নয়, ইহাকে মহাধান্দা বলা যেতে পারে। তবে এই লোকটা কী আসলেই বিপদগ্রস্ত ছিলো, নাকি ধান্দাবাজ?- এই প্রশ্নটা আজও মনের মধ্যে রয়ে গেল!

লেখক: নাঈম হাবিব, সৌজন্যে: বিডিনিউজ