দক্ষিণ কোরিয়ায় যেভাবে চলছে কোচিং বাণিজ্য

Korean-private-schoolsসম্প্রতি দেশে কোচিং সেন্টার বন্ধ বা কোচিং বিজনেস বন্ধ নিয়ে নানা ধরনের আয়োজন চলছে। ২/৪ টি টকশো এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নানা আলোচনায় কোরিয়ার কোচিং পরিচালনায় সফলতার উদাহারন দিয়েছেন অনেকেই। আমরা যারা কোরিয়া প্রবাসী সবাই Hagwon বা কোচিং নিয়ে মোটামুটি জানি। আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম অর্থাৎ কোরিয়া প্রবাসীদের ছেলে মেয়েরা এই সব কোচিংগুলোতে যাতায়াত করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার আইন অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো (সরকারী বা বেসরকারী) অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আর কোচিং একাডেমীগুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচিত।

কোরিয়ার কোচিংগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এগুলো cram-schooling যেটা বিশেষায়িত স্কুল। আর এটার মুল ভিত্তি হল ‘সম্পূরক শিক্ষা পদ্বতি যার মাধ্যমে নিয়মিত স্কুল পাঠ্যক্রমের সাথে সামন্জস্য রেখে কিংবা সম্পর্কীয় পাঠ্যক্রম যা নিয়মিত স্কুল ছাত্রদের বা পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য বেশ ভাল ভুমিকা পালন করে। সাথে অনেক বিশেষায়িত কোর্স বা নানা ধরনের কারিকুলাম নিয়ে কোচিং একাডেমীগুলো কাজ করে, যেমন Tekwondo, Art-Culture, Driving,technical education, Languages Education সহ নানা কোর্স। কোচিং একাডেমী বা Hagwon কোরিয়ান ছাত্রছাত্রীদের জীবনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে বেশ প্রভাব বিস্তার করে। শিক্ষার সাথে সাথে নীতি-নৈতিকতা এবং নানা ধরনের সামাজিক সম্পর্ক বা বন্ধুত্বের মতো ব্যাপারগুলো শেখানোর ক্ষেত্রে এই সব প্রাইভেট কোচিং একাডেমী বেশ ভাল রোল-প্লে করে বলা যায়।

korea-coathing-center
নানা কোচিং সেন্টারে ভর্তি এই ভবন

বিশেষায়িত শিক্ষা সমাজে নানা ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে এটা বিবেচনায় নিয়ে আশির দশকে (প্রেসিডেন্ট Chun Doo-hwan সময়) আইন করে প্রাইভেট একাডেমীগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল । কিন্তু পরে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোর্টের এক যুগান্তকারী রায়ের কারণে সরকার প্রাইভেট একাডেমীগুলোর ফি নেওয়ার ক্ষেত্রে নজরদারী বা নির্ধারণ করে দিয়ে প্রাইভেট একাডেমীগুলোর কার্যক্রম উম্মুক্ত করে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে কোরিয়ার কোচিং বা প্রাইভেট একাডেমীগুলো সরকারী নিয়ন্ত্রণেই মোটামুটি চলে যায় বলা যায়।

কিছু বিধিনিষেধ এখানে উল্লেখ করছি।

-পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম সরকার অনুমোদিত বা ক্ষেত্র বিশেষ এ এসোসিয়েশন কর্তৃক অনুমোদিত (এসোসিয়েশন গুলোতে সরকারী প্রতিনিধি থাকে এবং বা মন্ত্রণালয়ের মনিটরে থাকে)

-কোচিং বা এই টাইপের একাডেমী’র শিক্ষক হতে হলে তার জন্য লাইসেন্স বা অনুমতি লাগবে। (সাধারণ স্কুলগুলোর শিক্ষকেরা এই সব একাডেমীতে পড়াতে পারবে না কিন্ত স্কুলগুলোর শিক্ষকদের চাকুরীর নিরাপত্তা বা উন্নত জীবনমানের নিশ্চয়তা সহ সামাজিক উচ্চ মর্যাদা আছে)। যে কেউ গিয়ে কোন একাডেমীতে পড়াতে পারে না।

-একাডেমীগুলোর নির্ধারিত শিক্ষাসময় সুচী সিটি কর্পোরেশন বা শিক্ষাবিষয়ক সরকারী অফিসকে জানাতে হয়।

-একাডেমীগুলোর বিরুদ্ধে কোন অনিয়মের অকাট্য প্রমাণসহ কোন নাগরিক যদি কোন অভিযোগ আনে ওই ক্ষেত্রে যিনি অভিযোগ জানান তাকে সিটি কর্পোরেশন বা শিক্ষা বিষয়ক অফিসগুলো পুরস্কৃত ও করে।

-কোন বাড়তি বা প্রতারণামুলক বিজ্ঞাপন দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী নিলে কঠোর আইনী ব্যবস্হা নেওয়া হয়।

-কোরিয়াতে এক লক্ষের ও বেশী প্রাইভেট একাডেমী আছে আর শতকরা ৮৩ ভাগের ও বেশী ছাত্র-ছাত্রী এই সব একাডেমীগুলোতে যায় ( হাইস্কুল/ উচ্চমাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি’র মতো ব্যাপার গুলো বেশী ফোকাস থাকে)।

আরো অনেক ভাল ভাল অনেক বিষয়াদি প্রয়োগ করা হয় কোচিং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। কিন্ত শুরুতে এই সেক্টরে নানা ধরনের নৈরাজ্য ছিল। আসল ব্যাপার হল সিস্টেম। যেটা করার বা ব্যবস্হাপনার দায় রাষ্ট্রের। সেটা কোরিয়ার সরকারগুলো ভাল মত করছে এবং তার সুফল পাচ্ছে সবাই। আর এই কারণে কোরিয়ান শিক্ষার নানা মডেল বেশ আলোচিত।

দেশের কোচিং সেন্টার বিতর্কে কোরিয়া উদাহারণ আনার ক্ষেত্রে এইসব কিছু ব্যাপার ও আমলে আনা দরকার। যথাযথ নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের প্লান নিয়ে কথা বলা উচিত। এত বড় বিশাল সেক্টর হুটহাট করে বন্ধ করে দেওয়ার আগে অনেক পারিপার্শ্বিক উপাদানগুলো আমলে নেওয়া দরকার।

নিজের ২/১ টি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। Tekwondo একাডেমী নিয়ে আমার ধারণা ছিল ওখানে মারপিট, আত্মরক্ষা এই সব শেখানো হয়। আমার মেয়ে Tekwondo একাডেমী শুরু করার বেশ কিছুদিন পর একটি প্রোগ্রামে গিয়ে অনেক কিছু জানলাম। ওদের শেখানো হচ্ছে অভিভাবকদের কিভাবে কম stress বা stress না দেওয়া যায়। তেকোয়ানডোর পাশাপাশি নানা ধরনের Moral Lession, Leadership শেখানো হচ্ছে সেখানে। ব্যাপারটা বেশ ভাল লাগলো। পরে দেখলাম ওদের যতগুলো বেল্ট দেওয়া হচ্ছে সবগুলোই সরকারী নিয়ন্ত্রিত বোর্ড বা এসোশিয়েশন কর্তৃক পরীক্ষার মাধ্যমে ।

কোরিয়ান স্কুলে যাওয়ার পর মেয়ে টুকটাক অংকের সমস্যা সমাধাণের জন্য এক প্রাইভেট কোচিং এর কাছে দিয়েছিলাম। বেশকিছু দিন যাওয়ার পর মেয়ের মা খেয়াল করলো তাকে স্কুলের অংকের বাইরে অন্য টাইপের অংক শিখাচ্ছে। সাথে বেশ ভাল লেভেল হোমওয়ার্ক দিচ্ছে। একদিন শিক্ষিকার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম যে স্কুলের অংক হুবহু তারা শিখাবে না। (সাধারণ স্কুলের অংক শিখানোর দায় ওই স্কুলের ক্লাস টিচারেই) আর একাডেমীতে শুধু এদের কারিকুলাম নিয়ে অংক শিখতে হবে। কিন্ত অংক চর্চায় সেটা আসলেই বেশ ভাল কাজ দিচ্ছে।

কোন আইন করার আগে তার ভাল খারাপ দিক বিবেচনায় নিয়ে আইন করা উচিত।

লেখক- এম এন ইসলাম, সিইও, টিকন সিস্টেম, সিউল।