
ফাইল ছবি
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচন শেষেই তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচনে যে সরকার গঠিত হবে, তার কোনো পদেই তিনি থাকবেন না।
বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেসারেট নিউজে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানিয়েছেন নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ।
নিবন্ধে গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং সংস্কার কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা আলোকপাত করেন তিনি।
পাঠকদের জন্য তার হুবহু অনুবাদ তুলে ধরা হলো-
গত বছর এই মাসেই বাংলাদেশের ইতিহাস বাঁকবদল করে। হাজার হাজার সাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছাত্র-জনতা এ সময় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নেমে এসেছিল। নির্মম দমন-পীড়নের মধ্যেও তারা টিকে থেকে শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতিত স্বৈরশাসককে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে।
স্বৈরশাসকের পতনের পর সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতায় ছাত্রনেতারা আমাকে অনুরোধ জানায়, যেন আমি জাতিকে স্থিতিশীল করার দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে যোগদান করি। আমি প্রথমে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও তরুণদের ত্যাগ ও জীবনের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হই। এরপর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নীতি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি মন্ত্রিসভার সাথে শপথ গ্রহণ করি।
সরকারি চাকরিতে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বিশ্বের প্রথম জেনারেশন জেড বিপ্লব হিসেবে পরিচিতি পায়। তরুণদের এই উদ্যোগকে যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বৈষম্যের মতো মানবতার বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলা হচ্ছে। আমাদের সৌভাগ্য যে তারা বুঝতে পেরেছিল যে এখনই পদক্ষেপ নেয়ার সময়।
স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে আমাদের উত্তরণ যে এগিয়ে চলেছে তার স্পষ্ট লক্ষণগুলির মধ্যে একটি ছিল যখন দ্য ইকোনমিস্ট ২০২৪ সালের জন্য বাংলাদেশকে “বর্ষসেরা দেশ” হিসেবে ঘোষণা করে। আমরা অর্থনীতি পুনর্গঠন, নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং কোটি কোটি ডলার চুরি যাওয়া সম্পদ উদ্ধারে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে তখন পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারিনি যে বিশ্ব আমাদের অগ্রগতি কতটা দৃঢ়ভাবে লক্ষ্য করেছে। আমরা আমাদের যাত্রার ডেসেরেট নিউজের চমৎকার কভারেজেরও গভীর প্রশংসা করেছি।
এই অগ্রযাত্রার প্রতিফলনও দেখা গেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের স্বীকৃতি হিসেবে দ্য ইকোনমিস্ট ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে ‘বর্ষসেরা দেশ’ ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ‘ডেসেরেট নিউজ’ বাংলাদেশের যাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশেষ কভারেজ প্রকাশ করে, যা খুবই প্রশংসিত হয়।
আমাদের শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলির মধ্যে একটি ছিল পূর্ববর্তী শাসনামলে নির্মমভাবে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের সাথে শোক প্রকাশ করার সময় ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন কিনা, তা নিশ্চিত করা। পূর্ববর্তী সরকার ও তার সহযোগীদের লুট করা অর্থ পুনরুদ্ধারেও আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ অনুমান করে যে সরকার ১৫ বছর ধরে প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে। এই অর্থের জন্য লড়াই করা মূল্যবান; ঝুঁকিগুলি বিশাল।
দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার সামনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। কার্যত পুলিশ দায়িত্বে ছিল না, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছিল, অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, গণতন্ত্র ভেঙে পড়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালিত নির্যাতন কক্ষে হাজারো মানুষ আটকে ছিল, সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতি নির্ভর করত ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যের ওপর। ধীরে ধীরে আমরা পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করি। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে থাকা রাজনৈতিক দল, নতুন দলসমূহ এবং সশস্ত্র বাহিনী আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখে। বিশেষত ৫ আগস্ট বিক্ষোভ দমন করতে বলা হলেও সেনারা সংযম দেখিয়েছিল।
আমি স্পষ্ট করে দিয়েছি, আগামী ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমি পরবর্তী সরকারে কোনো পদে দায়িত্ব পালন করব না।
আমি আরো বলেছি, আমাদের প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেয়া। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের কাছে তাদের দাবি জানাতে পারবে। প্রবাসীসহ সকল যোগ্য নাগরিককে তাদের ভোট প্রদানের সুযোগ করে দেয়া যদিও বিশাল কাজ, তবুও আমরা সেটি সম্পন্ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সাথে আমরা ইতিবাচক সম্পর্ক জোরদার করেছি। বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস।
ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সমর্থনের জন্য আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। সম্প্রতি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে ফলপ্রসূ ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছি, যা আমাদের উভয় জাতির জন্য উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও জাতিসঙ্ঘ বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের পরামর্শে আমরা বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাব করেছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো সাংবিধানিক সংশোধনী, যেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আর কখনো স্বৈরতন্ত্রের দিকে না যায়।
বাংলাদেশী তরুণদের, বিশেষ করে প্রবাসীদের, সাহসিকতা ও ত্যাগের জন্য আমরা প্রশংসা করি। তাদের উদাহরণ থেকেই আশা করা হচ্ছে যে জেনারেশন জেড, এক্স, মিলেনিয়াল এবং আলফা মিলে গড়ে তুলবে ‘তিন শূন্যের বিশ্ব’- শূন্য বেকারত্ব, শূন্য দারিদ্র্য ও শূন্য কার্বন নির্গমন।
বাংলাদেশ যদি এমন এক দেশে রূপ নেয়, যেখানে সবাই নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে বসবাস করতে পারে, তবে তা সম্ভব হবে লাখ লাখ মানুষের কল্পনা, সাহস ও দৃঢ় সংকল্পের কারণে। এই যাত্রায় উটাহসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বন্ধুদের সমর্থনও বাংলাদেশের জন্য এক বড় আশার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র : ডেসারেট












































