
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। নারী ও তরুণ ভোটারের ব্যাপক উপস্থিতি এই নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল।
শুক্রবার ভোর ৫টা পর্যন্ত পাওয়া প্রাথমিক ফল অনুযায়ী ২৯৯ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৮০টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি ৫৪টি, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি ২টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে জয় পেয়েছে। এ ছাড়া ৭টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
সরকারি সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ২০২টি, জামায়াত ৬৪টি, এনসিপি ৫টি, গণঅধিকার পরিষদ ২টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১টি এবং ১২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।
ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনে তারা আত্মবিশ্বাসী। ৩০০ আসনের সংসদে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১ আসন।
এবারের সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। এই প্রস্তাবে এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে রূপান্তরের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দলীয় নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনিই এবার প্রথম প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগেই জানিয়েছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী হবেন তারেক রহমান।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে মূল চিত্র ছিল একমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কারণ হিসেবে তারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়াকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত থাকায় বিরোধী ভোট একত্রিত হয়েছে এবং এর সুবিধা পেয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে, জামায়াত ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভোট ও আসনের পথে রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটার অংশ নেওয়ায় ফলাফলে তার প্রভাব পড়েছে। তরুণ ভোটাররা দলীয় ঐতিহ্যের চেয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নারীর উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৯ শতাংশ।
একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটারদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক ক্ষেত্রে তারা সম্ভাব্য বিজয়ী বা স্থানীয়ভাবে নিরাপদ মনে হওয়া প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট মিলিয়ে ৬১ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। চূড়ান্ত হিসাবের পর এই হার আরও বাড়তে পারে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে এবং সহিংসতার আশঙ্কা ছিল।
তবে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা ও জাল ভোটের অভিযোগ থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতসহ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে—যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল ঘটনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৫ শতাংশ, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যথাক্রমে ৭৫ ও ৭৬ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ছিল ৮৭ শতাংশ। এবারের নির্বাচন আরেকটি দিক থেকে ব্যতিক্রম—সংঘাত-সহিংসতায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দেড় বছরের প্রস্তুতির পর বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় বহুল প্রত্যাশিত সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট। ভোটাররা সাদা ব্যালটে সংসদ নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোটে ভোট দেন।









































