
ইরানের লক্ষ্য এখন শুধু যুদ্ধবিরতি নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী এমন একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের গঠনমূলক আলোচনা চলছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এই দাবি অস্বীকার করে এটিকে তেলের দাম কমানোর উদ্দেশ্যে ছড়ানো ভুয়া খবর বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে পর্দার আড়ালে মিশর, তুরস্ক ও পাকিস্তান সাম্প্রতিক কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি পরোক্ষ যোগাযোগের চ্যানেল তৈরি করেছে বলে অঞ্চলটির দুই জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে। তবুও সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগের ক্ষীণ সুযোগ তৈরি হলেও যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এখনো সন্দিহান, কারণ সংঘাতরত পক্ষগুলোর অবস্থান এখনো অনেক দূরে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই তেহরানের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে, ধারাবাহিক হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়েছে। পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে। তবে বাস্তবে ইরান যে এখনো চাইলে নির্ভুলভাবে হামলা চালাতে সক্ষম তার প্রমাণ দিয়েছে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল রপ্তানি যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়, সেখানে বর্তমানে শত শত জাহাজ অচল অবস্থায় রয়েছে। এদিকে ইরান অঞ্চলজুড়ে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি গ্রহণ করে প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে—যাতে যে কোনো হুমকির জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হয়।
গত সপ্তাহেই ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালানোর পর পাল্টা আঘাতে ইরানি বাহিনী কাতারের প্রধান গ্যাস স্থাপনায় হামলা করে, যার ফলে দেশটির প্রায় ১৭ শতাংশ রপ্তানি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে আরাদ ও ডিমোনা শহরে আঘাত হানে, এতে ১৮০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের লক্ষ্য এখন শুধু যুদ্ধবিরতি নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী এমন একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে।
ইরানের নতুন ‘রেড লাইন’
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা জানিয়েছেন, তারা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর হামলা না করার নিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো চান।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, তেহরান নিজেদের শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে চাইবে এবং এর সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ক্ষতিপূরণ ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে।
তার ভাষায়, ‘হরমুজ প্রণালী এখন ইরানের হাতে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করার অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সেখানে টোল বা ফি আদায়ের বিষয়টিও ইরানের অভ্যন্তরে আলোচনায় এসেছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের ছাড় না পেলে ইরান এই কৌশলগত সুবিধা সহজে ছাড়বে না। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে তারা এমন কিছু অর্থনৈতিক স্বস্তি পেয়েছে, যা আগে কূটনীতির মাধ্যমে পায়নি। উদাহরণ হিসেবে, তেলের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সমুদ্রে থাকা প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল কেনার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র কী চায়?
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম দাবি ছিল—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। যদিও গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার দাবি করেছিল ওয়াশিংটন।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো চান ইরান যেন প্রায় অস্ত্রমানের কাছাকাছি সমৃদ্ধ করা ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করে। ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ওই মজুত যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া থেকে সরে আসার দাবিও জানিয়েছিল। তবে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এখন ইরানকে সর্বোচ্চ ১,০০০টি মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রাখার প্রস্তাব দিয়েছে—যা আগের দাবির তুলনায় কিছুটা নমনীয়।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার বড় সংকট রয়েছে। কারণ, ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলোচনার সময়ই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছিল। এছাড়া ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানে সরকার পরিবর্তন।
আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন কে?
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—ইরানের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন কে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আলি লারিজানি, যিনি আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
মঙ্গলবার ইরান সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব হিসেবে মোহাম্মদ বাকের জোলঘাদরকে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সাবেক কমান্ডার।
ইরান বিশ্লেষক বাবাক ভাহদাদের মতে, এই নিয়োগ ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যৎ আলোচনায় আইআরজিসির নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারই বেশি প্রাধান্য পাবে।
তার ভাষায়, ‘খোলাখুলি বললে—এটি আপসের প্রস্তুতির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সামলানোর প্রস্তুতির মতোই বেশি মনে হচ্ছে।’
যুদ্ধ থামানোর পথ কতটা কঠিন?
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন সাময়িকভাবে হামলা স্থগিত রাখার পেছনে মূল কারণ ছিল তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক তেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনও করছে। গত সপ্তাহে প্রায় ২,৫০০ মেরিন সেনা ও একটি অ্যামফিবিয়াস আক্রমণ জাহাজ পাঠানো হয়েছে। এর আগে মার্চের মাঝামাঝি জাপানভিত্তিক ইউএসএস ট্রিপোলি যুদ্ধজাহাজও ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়।
যদিও ট্রাম্প স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি, তবে তিনি ইরানের খারগ দ্বীপ দখলের ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। পারস্য উপসাগরের এই দ্বীপ থেকেই ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক গবেষক ধ্যাপক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এমন পরিস্থিতি মেনে নেবে না যেখানে হরমুজ প্রণালীর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে।
তার মতে, ‘কূটনৈতিক আলোচনা এক জিনিস, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা আরেক জিনিস। যদি ইরান প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি না হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সামরিক পথই হয়তো বেছে নিতে হতে পারে।’










































