
সমাজ ও রাজনীতিতে জনতার ভূমিকা নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে বহু পরিবর্তনের পেছনে জনতার আন্দোলন কাজ করেছে। তবে সব ধরনের জনসমাবেশ বা জনতার চাপ এক ধরনের নয়। কখনো তা স্বতঃস্ফূর্ত ও আবেগনির্ভর ‘মব’, আবার কখনো তা সংগঠিত, লক্ষ্যভিত্তিক ‘প্রেশার গ্রুপ’। বাইরে থেকে অনেক সময় দুটিকে একই রকম মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের চরিত্র, উদ্দেশ্য, সংগঠন এবং প্রভাবের ধরন একেবারেই ভিন্ন।
আজকের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায়—বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে—এই দুই ধারণা আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। তাই মব (Mob) ও প্রেশার গ্রুপ (Pressure Group)-এর পার্থক্য বোঝা জরুরি।
মব কী?
‘মব’ বলতে সাধারণত এমন একটি জনসমাবেশকে বোঝায়, যা হঠাৎ করে তৈরি হয় এবং প্রধানত আবেগ, উত্তেজনা বা ক্ষোভের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। মবের সদস্যরা সাধারণত কোনো আনুষ্ঠানিক সংগঠনের অংশ নয়; বরং একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তারা দ্রুত জড়ো হয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মব মূলত ‘collective behaviour’-এর একটি রূপ। এখানে ব্যক্তিরা ভিড়ের অংশ হয়ে নিজের ব্যক্তিগত চিন্তা বা যুক্তির চেয়ে ভিড়ের আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়।

মবের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—
১. স্বতঃস্ফূর্ততা: মব সাধারণত পরিকল্পিত নয়। কোনো ঘটনা—যেমন দুর্ঘটনা, গুজব, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সামাজিক ক্ষোভ—হঠাৎ করে মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে আনে।
২. আবেগপ্রবণতা: মবের সিদ্ধান্ত অনেক সময় যুক্তির চেয়ে আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে কখনো কখনো সহিংসতাও দেখা যায়।
৩. অস্থায়ী প্রকৃতি: মব দীর্ঘ সময় টিকে থাকে না। পরিস্থিতি শান্ত হলে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হস্তক্ষেপ করলে তা দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
৪. নেতৃত্বের অভাব: মবের সাধারণত স্পষ্ট নেতৃত্ব থাকে না। অনেক সময় ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন ব্যক্তি পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু তা স্থায়ী নেতৃত্ব নয়।
উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন দেশে হঠাৎ সংঘটিত গণপিটুনি, গুজবের কারণে সহিংসতা বা তাৎক্ষণিক বিক্ষোভকে মব আচরণ বলা হয়।
প্রেশার গ্রুপ কী?
প্রেশার গ্রুপ বা চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হলো এমন একটি সংগঠিত দল, যারা নির্দিষ্ট স্বার্থ বা লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার, নীতিনির্ধারক বা জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানে প্রেশার গ্রুপকে অনেক সময় ‘interest group’, ‘advocacy group’, ‘lobby group’-ও বলা হয়। এরা সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে চায় না, বরং নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে চায়।
প্রেশার গ্রুপের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
১. সংগঠিত কাঠামো: প্রেশার গ্রুপের সাধারণত একটি সংগঠন থাকে—নেতৃত্ব, সদস্য, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা থাকে।
২. নির্দিষ্ট লক্ষ্য: তারা কোনো নির্দিষ্ট দাবি বা স্বার্থ নিয়ে কাজ করে। যেমন শ্রমিক অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, ব্যবসায়িক স্বার্থ ইত্যাদি।
৩. দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম: মবের মতো অস্থায়ী নয়; প্রেশার গ্রুপ দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে।
৪. কৌশলগত চাপ: তারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে সরকার বা প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে—লবিং, গণস্বাক্ষর, প্রচারণা, গবেষণা প্রতিবেদন, গণমাধ্যমে বক্তব্য ইত্যাদির মাধ্যমে।
উদাহরণ হিসেবে পরিবেশবাদী সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন বা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে প্রেশার গ্রুপ হিসেবে ধরা যায়।

মব ও প্রেশার গ্রুপের প্রধান পার্থক্য
দুটি ধারণার মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে।
১. সংগঠন ও কাঠামো
মব সাধারণত অসংগঠিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত। কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো বা সদস্যপদ থাকে না। অন্যদিকে প্রেশার গ্রুপ সংগঠিত। তাদের নেতৃত্ব, সদস্য, নীতি ও কর্মপরিকল্পনা থাকে।
২. আবেগ বনাম কৌশল
মব আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয়। কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকে এটি তৈরি হয়। প্রেশার গ্রুপ কৌশলগতভাবে কাজ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে।
৩. স্থায়িত্ব
মব অস্থায়ী এবং দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রেশার গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালায় এবং ধারাবাহিকভাবে নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে চায়।
৪. নেতৃত্ব
মবের স্পষ্ট নেতৃত্ব সাধারণত থাকে না। প্রেশার গ্রুপের নির্দিষ্ট নেতৃত্ব থাকে এবং তারা সংগঠিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।
৫. প্রভাবের ধরন
মব অনেক সময় তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করে—কখনো সহিংসতার মাধ্যমে। প্রেশার গ্রুপ সাধারণত আইনগত ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন বাস্তবতা
ডিজিটাল যুগে মব ও প্রেশার গ্রুপের সীমারেখা অনেক সময় ধুসরা হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাপক জনরোষ তৈরি হতে পারে। এই ধরনের দ্রুত প্রতিক্রিয়াকে অনেক বিশ্লেষক digital mob বা online mob behaviour বলেন।
অন্যদিকে প্রেশার গ্রুপগুলোও এখন সোশ্যাল মিডিয়াকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে। অনলাইন পিটিশন, হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন বা ডিজিটাল আন্দোলনের মাধ্যমে তারা দ্রুত জনমত তৈরি করতে পারে।
ফলে আধুনিক রাজনীতিতে জনমত তৈরির প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক দ্রুত হয়ে গেছে।

গণতন্ত্রে দুইয়ের ভূমিকা
গণতান্ত্রিক সমাজে প্রেশার গ্রুপকে সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। কারণ তারা নাগরিকদের বিভিন্ন স্বার্থ ও দাবি সরকার পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রেশার গ্রুপ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে, কারণ তারা নীতিনির্ধারণে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে।
তবে মব আচরণ অনেক সময় গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ আবেগনির্ভর ভিড় কখনো আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। তবে এটাও সত্য যে অনেক সময় মব আচরণ সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ এটি সমাজে জমে থাকা অসন্তোষের একটি লক্ষণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
সবমিলিয়ে, মব ও প্রেশার গ্রুপ—দুটিই জনতার শক্তির প্রকাশ। তবে তাদের চরিত্র একেবারেই আলাদা। মব হলো স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগনির্ভর ও অস্থায়ী জনসমাবেশ। অন্যদিকে প্রেশার গ্রুপ হলো সংগঠিত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী।
গণতান্ত্রিক সমাজে সংগঠিত ও দায়িত্বশীল প্রেশার গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আবেগনির্ভর মব আচরণ যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তবে তা সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
তাই সচেতন নাগরিক সমাজের জন্য এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা জরুরি—যাতে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও দায়িত্বহীন ভিড়ের আচরণের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানা যায়।
তথ্যসূত্র:
1. J.Smelser, Theory of Collective Behavior, Free Press, 1962.
2. David Truman, The Governmental Process: Political Interests and Public Opinion, Knopf, 1951.
3. Alan Marsh, Pressure Groups in British Politics, Routledge, 1998.
4.Encyclopaedia Britannica, entries on ‘Mob’ and ‘Pressure Group’.
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প








































