
তখনকার ঢাকায় এমন বিশাল, আড়ম্বরপূর্ণ স্থাপনা খুব একটা ছিল না
পুরান ঢাকার ব্যস্ততা, ভিড় আর ইতিহাসের গন্ধে ভরা অলিগলির মাঝেই সদরঘাট থেকে ফরাশগঞ্জ যাবার পথে হঠাৎ চোখে পড়ে এক লালচে স্থাপনা—দেখলেই মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে। এটাই লালকুঠি বা নর্থব্রুক হল। এর পাশেই রয়েছে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাব। অনেকেই লালকুঠির পাশ দিয়ে হেঁটে যান, কেউ কেউ ছবি তোলেন, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো কতজন জানেন?
এই ভবন শুধু ইট-পাথরের গাঁথুনি নয়, এটি এক সময়ের সাংস্কৃতিক স্পন্দন, ঔপনিবেশিক ইতিহাস আর ঢাকার নগরজীবনের পরিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী।
ঔপনিবেশিক স্মৃতির এক প্রতীক
লালকুঠির আসল নাম ‘নর্থব্রুক হল’। নামটি এসেছে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুকের নাম থেকে। ১৮৭৪ সালে তিনি ঢাকায় সফরে আসেন। সেই সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে এই ভবন নির্মাণ করা হয়।
তখনকার ঢাকায় এমন বিশাল, আড়ম্বরপূর্ণ স্থাপনা খুব একটা ছিল না। লাল ইটের গায়ে সাদা নকশা, খিলান দরজা, উঁচু ছাদ—সব মিলিয়ে এটি ছিল একেবারে ইউরোপীয় ধাঁচের স্থাপত্য। ভবনটির সামনে খোলা প্রাঙ্গণ, ভেতরে বড় হলরুম—সবই পরিকল্পিত ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্য।

কেন ‘লালকুঠি’?
নর্থব্রুক হল নামটি কাগজে-কলমে থাকলেও, স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এটি হয়ে ওঠে ‘লালকুঠি’। কারণ খুবই সহজ—এর লাল রঙের ইটের গাঁথুনি। পুরান ঢাকার মানুষ নাম সহজ করে নিতে ভালোবাসে। তাই ব্রিটিশ নাম হারিয়ে গিয়ে জায়গা করে নেয় এই সহজ, প্রাণবন্ত নাম।
আজও আপনি যদি পুরান ঢাকার কাউকে জিজ্ঞেস করেন, ‘নর্থব্রুক হল কোথায়?’—হয়তো একটু ভাববে। কিন্তু ‘লালকুঠি’ বললেই পথ দেখিয়ে দেবে।

একটা সময় ছিল, যখন লালকুঠি ছিল ঢাকার প্রাণকেন্দ্র
এক সময়ের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
একটা সময় ছিল, যখন লালকুঠি ছিল ঢাকার প্রাণকেন্দ্র। এখানে হতো নাটক, সঙ্গীতানুষ্ঠান, সাহিত্যসভা, বিতর্ক—সবকিছু। ব্রিটিশ আমলে ইউরোপীয় সমাজের লোকজন যেমন এখানে আসতেন, তেমনি ধীরে ধীরে বাঙালি অভিজাতরাও এই জায়গাকে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে গ্রহণ করেন।
ভাবুন তো—একটা সন্ধ্যা, চারপাশে লণ্ঠনের আলো, ভেতরে মঞ্চে নাটক চলছে, দর্শক আসনে জমে উঠেছে আড্ডা। তখনকার ঢাকার জন্য এটি ছিল এক আধুনিকতার প্রতীক।
স্থাপত্যের সৌন্দর্য
লালকুঠির দিকে ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, এটি শুধু একটি হলঘর নয়, বরং একটি শিল্পকর্ম। এর খিলানগুলোতে রয়েছে মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের মিশ্রণ। জানালাগুলো লম্বা, বাতাস চলাচলের জন্য উপযোগী। ছাদ উঁচু, যাতে গরম কম লাগে—তখন তো এয়ার কন্ডিশনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
বাইরের বারান্দা, খোলা জায়গা—সবই এমনভাবে তৈরি, যাতে মানুষ জড়ো হতে পারে, গল্প করতে পারে, অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারে। এক কথায়, এটি ছিল ‘পাবলিক স্পেস’-এর এক পুরনো সংস্করণ।

কখনো এটি সরকারি দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, কখনো অবহেলায় পড়ে থেকেছে
সময়ের সাথে পরিবর্তন
সময়ের সাথে সাথে লালকুঠির ব্যবহার বদলেছে। ব্রিটিশ শাসনের অবসান, দেশভাগ, স্বাধীনতা—সবকিছুর সাক্ষী থেকেছে এই ভবন। একসময় যে জায়গায় জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, সেখানে ধীরে ধীরে কমে আসে সেই উচ্ছ্বাস।
কখনো এটি সরকারি দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, কখনো অবহেলায় পড়ে থেকেছে। সংস্কারের অভাবে ভবনের অনেক অংশ নষ্টও হয়ে গেছে। তবে এখনো এর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে—একটা হারানো সময়ের স্মৃতি হয়ে।
নদীর ধারে এক নীরব দর্শক
লালকুঠি বুড়িগঙ্গা নদীর কাছেই অবস্থিত। একসময় নদীপথই ছিল প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। তাই এই জায়গার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। নদী দিয়ে আসা অতিথিরা এই হলেই সমবেত হতেন, আয়োজন হতো অনুষ্ঠান।
আজ বুড়িগঙ্গার চেহারা বদলে গেছে, কিন্তু লালকুঠি এখনো সেই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে। যেন পুরনো দিনের গল্প শুনিয়ে যেতে চায়—কিন্তু শোনার মানুষ কই?

এটি শুধু একটি পুরনো ভবন নয়—এটি আমাদের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের একটি দলিল
কেন জানা দরকার?
আমরা অনেক সময় বিদেশের স্থাপত্য, ইতিহাস নিয়ে মুগ্ধ হই। কিন্তু নিজের শহরের ভেতরেই যে এমন অসাধারণ ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে, তা জানি না। লালকুঠি সেই অজানা ইতিহাসেরই একটি অংশ।
এটি শুধু একটি পুরনো ভবন নয়—এটি আমাদের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের একটি দলিল। এখানেই একসময় গড়ে উঠেছিল ঢাকার নাগরিক সংস্কৃতি, আড্ডা, শিল্পচর্চা।
পুরান ঢাকার প্রতিটি ইটের ভেতরেই গল্প লুকিয়ে আছে। লালকুঠি সেই গল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম—যা শুধু দেখার নয়,অনুভবেরও বিষয়।
লালকুঠির সামনে দাঁড়িয়ে যদি একবার চোখ বন্ধ করেন, হয়তো শুনতে পাবেন পুরনো দিনের কোলাহল—হাসি, করতালি, নাটকের সংলাপ। তখন বুঝবেন, এই ভবনটি এখনো বেঁচে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প











































