বুধবার । এপ্রিল ৮, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বিনোদন ৭ এপ্রিল ২০২৬, ৫:০৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

দ্য কিউরিয়াস কেস অব ডিপজল


Dipjol cover

তিনি ঢাকাই সিনেমার ভিলেন চরিত্রকে এক ধরনের ‘গিমিক-অ্যাস্থেটিক’ জনপ্রিয়তায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, যা একই সঙ্গে অস্বস্তিকর এবং স্মরণীয়

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাদের কাজকে একক কোনো সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না। তারা ‘ভালো অভিনেতা’ বা ‘খারাপ অভিনেতা’—এই সরল শ্রেণিবিভাগ ভেঙে দিয়ে আলাদা এক রকম উপস্থিতি তৈরি করেন। ডিপজল ঠিক তেমনই এক নাম। তাকে অনেকে অশ্লীল বলেন, অনেকে বলেন অতিনাটকীয়, কেউ কেউ আবার একেবারেই খারিজ করে দেন। কিন্তু তার পর্দা-উপস্থিতি নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, একটি বিষয় অস্বীকার করা যায় না—তিনি ঢাকাই সিনেমার ভিলেন চরিত্রকে এক ধরনের ‘গিমিক-অ্যাস্থেটিক’ জনপ্রিয়তায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, যা একই সঙ্গে অস্বস্তিকর এবং স্মরণীয়।

ডিপজলের অভিনয়কে যদি খুব নিরপেক্ষভাবে দেখা যায়, তাহলে সেখানে ক্লাসিক অর্থে মেথড অ্যাক্টিংয়ের ছাপ খুব কম। বরং তিনি কাজ করতেন এক ধরনের ‘গিমিক প্লে’ দিয়ে—অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু এক্সপ্রেশন, ডায়ালগ ডেলিভারি, শরীরী ভাষা বারবার ব্যবহার করে একটি চরিত্রকে চিহ্নিত করে তোলা। এই রিপিটিশনই ছিল তার স্টাইল। আর আশ্চর্যের বিষয়, এই রিপিটেশনই দর্শকের মনে গেঁথে যেত।

নব্বই দশকের শেষভাগে মনতাজুর রহমান আকবরের পরিচালনায় ‘ভয়ংকর বিষু’ (১৯৯৯) সিনেমার কথা ধরা যাক। এখানে ‘জ্বলে আগুন বুকেতে’ গানটিতে বিষু তথা ডিপজলের চরিত্রের লালসা ও ক্ষমতার আগ্রাসন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। কিন্তু অভিনয়ের দিক থেকে সেখানে বৈচিত্র্যের ঘাটতি চোখে পড়ে। তার এক্সপ্রেশন অনেকটাই একরৈখিক, বারবার একই ধরনের রিঅ্যাকশন ফিরে আসে। এই জায়গাতেই দর্শক বুঝে যায়—তিনি চরিত্রকে ভাঙছেন না, বরং একটি নির্দিষ্ট ইমেজকে শক্তভাবে ধরে রাখছেন।

কিন্তু একই দৃশ্যের অন্য পাশে যদি তাকানো হয়, তাহলে দেখা যাবে চম্পা (চিত্রনায়িকা চম্পা) অভিনীত চরিত্রে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের পারফরম্যান্স। চম্পা তার অভিনয়ে যে বৈচিত্র্য ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এনেছিলেন, তা গানের ভেতরের টেনশন ও আবেদনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ডিপজলের গিমিকের বিপরীতে চম্পার সূক্ষ্ম অভিনয় এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করে—যেখানে ডিপজল নিজেকে দেখান, কিন্তু চম্পা চরিত্রটিকে অনুভব করান ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন।

Dipjol inner 3

একই বছরে কাজী হায়াতের ‘ধর’ (১৯৯৯) সিনেমায় ডিপজলের আরেকটি ভিন্ন রূপ দেখা যায়। সেখানে টাকা আদায়ের একটি দৃশ্যে, একজন কবি যখন তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা উচ্চারণ করেন, তখনও ডিপজলের প্রতিক্রিয়া থাকে খুবই সরলরৈখিক। কিন্তু এই দৃশ্যের আসল শক্তি আসে বাইরের প্রতিক্রিয়া থেকে—কবির প্রতিবাদ থেকে। এখানে সিনেমা যেন নিজেই নিজের ভেতরে একটি মেটা-কমেন্ট করে ফেলে: শিল্পী যতই শক্তিশালী হোক, সে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরেই বন্দি।

এই জায়গায় ডিপজলের অভিনয় ইচ্ছাকৃত না হলেও একটি ধারণাকে শক্তিশালী করে তোলে—তিনি প্রতিক্রিয়া দেন কম, উপস্থিত থাকেন বেশি।

আবার ‘আম্মাজান’ (১৯৯৯)-এ কালাম চরিত্রে তাকে দেখা যায় একেবারে আলাদা প্রেক্ষাপটে। মান্নার বিপরীতে তিনি এখানে যে ভয়াবহতা তৈরি করেন, তা অতিনাটকীয় নয়, বরং এক ধরনের ‘স্বাভাবিক নিষ্ঠুরতা’। বিশেষ করে ক্লাইম্যাক্সে গুলি করার দৃশ্যটি—যেখানে তিনি কোনো বড় ধরনের আবেগ দেখান না, বরং খুব স্বাভাবিকভাবে শত্রু নিধন করেন। এই ‘স্বাভাবিকতা’-ই তাকে ভয়ংকর করে তোলে।

ডিপজলের এই আপাত-নির্লিপ্ত, প্রায় যান্ত্রিক অভিব্যক্তির কারণ কী হতে পারে? অনেকেই বলেন, এটি তার ব্যক্তিগত জীবনের ছাপ। ঢাকার রাজনীতিতে যুক্ত থাকা, ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে কাজ করা এবং বাস্তব জীবনের ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—এসব মিলিয়ে তার কাছে এসব কোনো কাল্পনিক বিষয় ছিল না। ফলে পর্দায় সহিংসতা প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে আলাদা কোনো অভিনয়-প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি। তিনি যেন সেটাকে ‘পারফর্ম’ না করে ‘রিপ্রডিউস’ করেছেন।

এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তের পান্ডা এক গুণ্ডা (২০০১) সিনেমায় ‘সাবান দিমু ডইলা’ গানে। এখানে সহ-অভিনেত্রী শানুর পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাণবন্ত হলেও ডিপজল একই ধাঁচের এক্সপ্রেশনে স্থির থাকেন। তিনি কমেডির মধ্যেও নিজের ডার্ক ইমেজ ধরে রাখেন, যা এক ধরনের অদ্ভুত কন্ট্রাস্ট তৈরি করে।

একই পুনরাবৃত্তি দেখা যায় গুণ্ডা নাম্বার ওয়ান (১৯৯৯)-এর ‘আয়নারে কাছে আয়নারে’ গানেও। লিরিক্যাল এক্সপ্রেশন ও দৃশ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সহ অভিনেত্রী শাহনাজের অভিনয় সাবলীলভাবে বদলালেও ডিপজল যেন নিজের নির্দিষ্ট মুখভঙ্গির মধ্যে আটকে থাকেন। এই সীমাবদ্ধতাই আবার তার ব্র্যান্ডিং হয়ে ওঠে—দর্শক জানে, ডিপজল মানেই এই ধরনের ডার্ক হিউমারাস ও আপাত ভয়ংকর উপস্থিতি।

তবে তার ক্যারিয়ারে একটি ব্যতিক্রমী মুহূর্ত আসে কাজী হায়াতের ‘ধাওয়া’ (২০০০) সিনেমায়। এখানে ‘পাগলা মতিন’ চরিত্রে তিনি মেথড অ্যাক্টিংয়ের কিছুটা কাছাকাছি পৌঁছান। বিশেষ করে ডিবি অফিসার নজরুলকে (কাজী হায়াত) হত্যা, তার পরিবারকে অপহরণ এবং প্রতিপক্ষকে নির্মমভাবে দৌড়ানি দেওয়ার দৃশ্যগুলোতে তিনি অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত এবং চরিত্র-নির্ভর হয়ে ওঠেন। “খায়া ল, এটাই তোর জীবনের শেষ খাওয়া”—এই ডায়ালগে তার ভয়ংকরতা আর গিমিক নয়, বরং এক ধরনের চরিত্রগত বাস্তবতা।

এই সিনেমাটিই দেখায়, ডিপজল সম্পূর্ণভাবে গিমিকে সীমাবদ্ধ নন। তিনি চাইলে চরিত্রকে গভীরতাও দিতে পারেন, যদি নির্মাতা কাজ আদায় করে নিতে পারেন।

পরবর্তীতে চাচ্চু এবং দাদীমা-র মতো সিনেমায় তাকে পজিটিভ চরিত্রেও দেখা যায়। তবে দর্শকের মনে তার আসল জায়গা তৈরি হয় ভিলেন হিসেবেই। বিশেষ করে তেজী (১৯৯৮)-এর “সানডে মানডে কোলোজ কইরা দিমু” ধরনের ডায়ালগ থেকে শুরু করে ভয়ংকর বিষু-র জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে তিনি একসময় ‘বিষু ভাই’ নামেও পরিচিত হয়ে যান।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার—ভিলেন আর অ্যান্টি-হিরো এক জিনিস নয়। ডিপজলের চরিত্রগুলো সাধারণত কোনো নৈতিক ধূসরতা তৈরি করে না। তারা পরিষ্কারভাবে ‘ইভিল’—একদম খাঁটি ভিলেন। এই নির্মম সরলতা দর্শকের মনে এক ধরনের ভয় তৈরি করে, কারণ এখানে কোনো ‘রিডিমিং কোয়ালিটি’ নেই।

তার অভিনীত ভিলেন চরিত্ররা প্রায়ই ডিস্টোপিয়ান বাস্তবতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ‘ধর’ বা ‘চাই ক্ষমতা’-র মতো সিনেমায় ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং সহিংসতার যে কাঠামো দেখানো হয়, সেখানে ডিপজল শুধু ব্যক্তি নন—একটি সিস্টেমের মুখ।

তবে তার একটি দুর্বলতার জায়গা ছিল ভাষা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতায়। ঢাকাই উপভাষার বাইরে প্রমিত বাংলায় তিনি খুব স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। যেমন ‘চাই ক্ষমতা’ (২০০৩) সিনেমায় মন্ত্রী সাদেকুর রহমান চরিত্রে পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকনের ইচ্ছায় ডিপজলকে প্রমিত বাংলা বলতে হয়। ব্যাপারটার সঙ্গে তিনি অভ্যস্ত হতে পারেননি। এই সিনেমায় তার স্বাভাবিক সাবলীলতা হারিয়ে যায়।

সবশেষে বলা যায়, ডিপজলের জনপ্রিয়তা কোনো ক্লাসিক অভিনয়-দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়নি। বরং দাঁড়িয়ে আছে এক ধরনের ‘অবিশুদ্ধ বাস্তবতা’-র ওপর—যেখানে অভিনয়, গিমিক, ব্যক্তিজীবন এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে মিশে গেছে।

তার অভিনয় দর্শকদের ভালো লাগুক বা না লাগুক, তার অভিনীত খলচরিত্রগুলো এক ধরনের সত্য তুলে ধরে। ঢাকার সেই সময়কার অন্ধকার, ক্ষমতা এবং সহিংসতার নির্মম চেহারা দর্শকদের কাছে স্পষ্ট হয়। আর একসময় সেই চেহারার সবচেয়ে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন ডিপজল— যিনি একই সঙ্গে অস্বস্তিকর, অদ্ভুত এবং অবিস্মরণীয়।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প