
১৯৭৭ সালের পর থেকে ভারতের অন্তত একটি রাজ্যে বামপন্থীরা সবসময় ক্ষমতায় ছিল
ভারতের রাজনীতিতে বড় ধরণের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। প্রায় পাঁচ দশক পর দেশটিতে ‘রাজ্যহারা’ হলো বামপন্থীদের রাজনৈতিক জোট- বামফ্রন্ট। অর্থাৎ ভারতের আর কোনো রাজ্যে বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় নেই। সর্বশেষ কেরালা রাজ্যে টিকে ছিল বামফ্রন্টের সরকার। এবারের নির্বাচনে সেখানেও ক্ষমতা হারিয়েছে তারা।
বামপন্থার রাজনীতিতে কেরালা এবং কেরালার ইতিহাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৫৭ সালে এই কেরালাতেই বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকে সর্বশেষ ২০২৬ সালের এপ্রিলের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কেরালায় পাল্টাপাল্টি ক্ষমতা ভাগাভাগি হয়েছে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের মধ্যে। অর্থাৎ একবার বামফ্রন্ট তো পরের বার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট। ২০১৬ সাল থেকে তো টানা দশ বছর কেরালার ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। টানা দুই দফা কোন দল বা জোটের ক্ষমতায় থাকার নজির এর আগে কেরালায় ছিল না। কিন্তু সবই এখন অতীত।
১৯৭৭ সালের পর থেকে ভারতের অন্তত একটি রাজ্যে বামপন্থীরা সবসময় ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেল। পুরোপুরি রাজ্যহারা হলো বামেরা।
ভারতের তিনটি রাজ্যকে বামপন্থী রাজনীতির ঘাঁটি হিসেবে ধরা হতো- কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা।
একসময় পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর আর ত্রিপুরাতে দুই দফায় ৩৫ বছর। এরমধ্যে দ্বিতীয় দফা ছিল টানা ২৫ বছরের। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে আর ত্রিপুরায় ২০১৮ সালে বিজেপির কাছে ক্ষমতা হারায় বামেরা। এই দুই রাজ্যে বর্তমানে বামফ্রন্টের অস্তিত্বই বিলীন হওয়ার পথে। সর্বশেষ ২০২৬-এর নির্বাচনে, যে নির্বাচনে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজেপি জয়লাভ করেছে, সেই নির্বাচনে বামফ্রন্ট জিতেছে মাত্র দুটি আসনে। ভাবা যায়! মাত্র পনেরো বছর আগে রাজ্যটিতে টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল তারা।
প্রায় একই অবস্থা ত্রিপুরাতেও। ফলে পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় বামেদের হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। যদিনা অবিশ্বাস কিছু ঘটে। একমাত্র সম্ভাবনা আছে, কেরালায়। কেরালার সম্ভাবনা পেছনে দুটি কারণ আছে।
প্রথমত, সেখানে বামপন্থী রাজনীতি এখনো কিছুটা অবশিষ্ট আছে। আর কেরালায় বামফ্রন্টের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বীতা কংগ্রেসের সাথে। সেখানে বিজেপি একেবারেই শক্তিশালী না। রাজ্যটিতে বিজেপির ডানপন্থার রাজনীতি এখনো সেভাবে জায়গা করতে না পারায় বামপন্থার রাজনীতির স্থান এখনো কিছুটা টিকে আছে।
দ্বিতীয় কারণ- কেরালার ক্ষমতার রাজনীতির পালাবদলের ইতিহাস। রাজ্যটিতে সাধারণত পাঁচ বছর পরপর ক্ষমতার হাতবদল হয়। ফলে, কেরালায় বামফ্রন্টের আশা এখনো আছে। কিন্তু সে তো পাঁচ বছর পরের কথা। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে ভারতের কোনো রাজ্যেই আর ক্ষমতায় নেই তারা।
আর শুধু রাজ্য নয়, ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও বামদের প্রভাব কমেছে। ২০০৪ সালের নির্বাচনে যেখানে তাদের ৬২টি আসন ছিল, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৮টিতে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—ভারতে কি বামপন্থার রাজনীতির শেষের পথে? নাকি আবারও বাম রাজনীতির উত্থান সম্ভব?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এখনই আশার বাতি নিভিয়ে দিচ্ছেন না। তাদের মতে, সমাজে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়ছে এবং অর্থনীতি ক্রমেই করপোরেট নির্ভর হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বামপন্থা এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে।
তবে তারা এও মনে করেন, সেক্ষেত্রে বাম দলগুলোকে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে—পুরনো ধ্যানধারণা ছেড়ে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলেই ভবিষ্যতে আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল











































