শুক্রবার । মে ২২, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ২২ মে ২০২৬, ৬:০৭ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরান যুদ্ধ ইউএই’র স্বপ্নকে যেভাবে চ্যালেঞ্জে ফেলল


UAE President

ইউএইএ’র প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ

দুই দশক ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) নিজেকে শুধু একটি ছোট উপসাগরীয় রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি প্রভাবশালী মধ্যম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। বন্দর নির্মাণ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, আঞ্চলিক মিত্রতা, আধুনিক সামরিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশটি এমন একটি ভাবমূর্তি গড়ে তোলে, যেখানে তাকে “লিটল স্পার্টা” বা ছোট কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো।

তবে সাম্প্রতিক ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত সেই ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। গত কয়েক মাসে ইরানের হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিপুল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও ইউএই এখনো ভূগোলগত বাস্তবতা এবং নিরাপত্তাগত ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়।

মিত্রদের প্রতি অসন্তোষ
ইউএইর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বন্ধুরা এখন দৃঢ় মিত্রের বদলে মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়েছে।’

এই মন্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে আবুধাবির হতাশা। দেশটি আশা করেছিল যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেবে। কিন্তু বাস্তবে সেই সমর্থন তারা পায়নি।

এদিকে ওয়াশিংটনে ইউএইর রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল-ওতাইবা আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় নিরাপদ ও সচল করার জন্য ইউএইর প্রস্তুতির কথা জানান। তবে এসব বক্তব্য মূলত শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের চেষ্টা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে এর আড়ালে রয়েছে কৌশলগত দুর্বলতার বাস্তবতা।

প্রভাব আছে, কিন্তু স্বাধীনতা নেই
প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের নেতৃত্বে ইউএই এমন এক রাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে, যেখানে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, তথ্যপ্রবাহ এবং আঞ্চলিক প্রক্সি সম্পর্ককে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

ইয়েমেন থেকে সুদান পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সম্পৃক্ততা, বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান এবং সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মাধ্যমে দেশটি তার আকারের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব অর্জন করে।

কিন্তু ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যখন উত্তেজনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ইউএইর এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মস্কো ইউএইর পক্ষে দাঁড়ায়নি। চীনও কেবল স্থিতিশীলতার আহ্বান জানিয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র আশ্বাস দিলেও দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ খুব কমই নিয়েছে।

অর্থনৈতিক শক্তিই হয়ে উঠেছে ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, ইউএইর সবচেয়ে বড় শক্তিই এখন তার অন্যতম দুর্বলতা। দেশটির অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আঞ্চলিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারী, বীমা কোম্পানি, শিপিং প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতার মধ্যে থাকা উপসাগরীয় অঞ্চলে ইউএইর বন্দর ও অবকাঠামো সহজেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই কেবল নিরাপত্তাহীনতার ধারণা তৈরি করাও আবুধাবির জন্য কৌশলগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।

উপসাগরীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা
ইরানের হামলার জবাবে ইউএই সীমিত সামরিক পদক্ষেপ নিলেও তা প্রতিরোধের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট হয়নি বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে দেশটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকেও আরও সক্রিয় সামরিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল, কিন্তু সাড়া মেলেনি।

এরপর থেকে ইউএই বিভিন্ন কূটনৈতিক ও গণমাধ্যম প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তবে এতে মাঝে মাঝে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি), আরব লীগ এবং পাকিস্তান, কাতার ও ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সমালোচনাও দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই ইউএইর মূল সমস্যা স্পষ্ট হয়। বহু বছর ধরে দেশটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে নিজস্ব প্রভাব বলয় তৈরির চেষ্টা করেছে। কিন্তু বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ভবিষ্যতের শিক্ষা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইবে এবং পশ্চিমা বিশ্বে নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরবে। কিন্তু শুধু কূটনৈতিক প্রচারণা বা শক্তির প্রদর্শন দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান নয়।

তাদের মতে, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন ও ইউএই—সব উপসাগরীয় রাষ্ট্র একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি। তাই আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

এই বাস্তবতা মেনে নেওয়াই এখন আবুধাবির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ‘লিটল স্পার্টা’ হিসেবে নিজেকে ব্যতিক্রমী শক্তি ভাবার পরিবর্তে, ইউএইকে স্বীকার করতে হবে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর মতো তার নিরাপত্তাও একটি যৌথ বাস্তবতার অংশ।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, ইউএইর মধ্যম শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এই বিশ্বাস যে সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছোট রাষ্ট্রের মৌলিক নিরাপত্তা দুর্বলতাকে পুরোপুরি দূর করতে পারে। ভবিষ্যতে ইউএইর নিরাপত্তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাস্তববাদী কৌশল এবং যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর—শুধু ব্যতিক্রমী শক্তির ভাবমূর্তির ওপর নয়।

মিডেল ইস্ট আই