
প্রতীকি ছবি
দীর্ঘ উত্তেজনা ও সংঘাতের পর ভারত ও পাকিস্তান কি আবার সংলাপের পথে হাঁটছে? সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও পর্দার আড়ালের কূটনৈতিক যোগাযোগ ঘিরে এমন প্রশ্নই এখন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সম্প্রতি ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আলোচনার দরজা কখনও পুরোপুরি বন্ধ করা উচিত নয়।’
তার এই মন্তব্য ভারতের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার সরকার বরাবরই বলে এসেছে, ‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।’
ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তান কাশ্মীর ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়। ২০২৫ সালের মে মাসে চার দিনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধও শুরু হয়েছিল ভারতশাসিত কাশ্মীরের পাহেলগামে হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে।
তবে হোসাবালের মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কী প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটি তারা পর্যবেক্ষণ করছে।
আরএসএসের বার্তা কি মোদির জন্য ‘রাজনৈতিক পথ’ তৈরি করছে?
বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকার সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানালে রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই আরএসএস বা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ‘সংলাপের বার্তা’ পাঠানো হচ্ছে।
ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ নারাভানেও সংলাপের পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনীতির সরাসরি সম্পর্ক নেই, আর জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইরফান নূরুদ্দিন-এর মতে, ‘মোদি সরকার নিজেদের কঠোর পাকিস্তানবিরোধী অবস্থানের কারণে এক ধরনের রাজনৈতিক কোণঠাসা পরিস্থিতিতে আছে। তাই আরএসএস বা সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সংলাপের আহ্বান সরকারকে রাজনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে।’
গোপনে চলছে বৈঠক
পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক জওহর সালিম জানিয়েছেন, গত এক বছরে ভারত ও পাকিস্তানের সাবেক কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা ব্যক্তিত্ব ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে অন্তত চারটি বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে মাসকাট,দোহা, থাইল্যান্ড ও লন্ডনে।
এসব বৈঠক ‘ট্র্যাক-১.৫’ ও ‘ট্র্যাক-২’ কূটনীতির অংশ, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তিরা অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করেন। সাধারণত আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সংলাপের আগে সম্পর্কের বরফ গলাতে এমন বৈঠক ব্যবহার করা হয়।
সালিমের মতে, এসব বৈঠক ভুল বোঝাবুঝি কমাতে এবং ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
পাল্টে যাচ্ছে ভূরাজনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের যুদ্ধের পর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনাতেও তিনি মধ্যস্থতা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাণিজ্য শুল্ক ও অভিবাসন নীতিকে কেন্দ্র করে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও কিছুটা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
অধ্যাপক নূরুদ্দিনের ভাষায়, ‘ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে ওয়াশিংটনে ভারতের প্রভাব বেশি ছিল, এখন পাকিস্তান আবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।’
উত্তেজনাও রয়ে গেছে
তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাও এখনো তীব্র। চলতি মাসেই ভারতের সেনাপ্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদী পাকিস্তানকে সতর্ক করে বলেন, যদি তারা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে, তাহলে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা ভূগোলের অংশ থাকবে নাকি ইতিহাসে পরিণত হবে।
এর জবাবে পাকিস্তানের সামরিক গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর ভারতীয় বক্তব্যকে ‘অহংকারী ও যুদ্ধোন্মাদ’ বলে অভিহিত করে। পাকিস্তান হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, যেকোনো হামলার পরিণতি শুধু ভৌগোলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
পানি বিরোধেও নতুন উত্তেজনা
এদিকে দ্য হেগের আদালত সম্প্রতি সিন্ধু নদ ব্যবস্থায় ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে একটি রায় দিয়েছে। পাকিস্তান রায়কে স্বাগত জানালেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ট্রাইব্যুনালটি ‘অবৈধভাবে গঠিত’ এবং এর সিদ্ধান্ত ‘অকার্যকর’।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সংলাপ এখনো অনেক দূরের পথ। তবে সাম্প্রতিক বার্তা ও গোপন যোগাযোগ ইঙ্গিত দিচ্ছে—দুই দেশ অন্তত আবার কথা বলার সম্ভাবনা যাচাই করতে শুরু করেছে।













































