শনিবার । জুন ২০, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ওয়ার্ল্ডকাপ গোল গ্রাফ ২০ জুন ২০২৬, ১:১১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

হাল ছেড়ো না বন্ধু!

ফুটবলে কি রাজনীতির ছায়া?


ইরান ফুটবল টিম- বিশ্বকাপ ২০২৬

বিশ্বকাপকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। এখানে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ এক পতাকার নিচে দাঁড়ায়: ফুটবলের পতাকা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সেই আদর্শ যেন আবারও কঠিন এক পরীক্ষার মুখোমুখি। কারণ মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এবার ইরানকে লড়তে হচ্ছে একাধিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে—ভিসার বেড়াজালের বিশ্বকাপ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলের ড্রয়ের পর ইরানের প্রধান কোচ আমির ঘালেনোই যে মন্তব্য করেছিলেন, তা বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত উক্তিতে পরিণত হয়েছে।

“আমরাই এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে নিপীড়িত দল।”

সাধারণ আবেগের বহিঃপ্রকাশ বলে উড়িয়ে দেওয়া যেতো তাঁর এমন দাবি, যদি না এমন দাবির পেছনে  একের পর এক বাস্তব অন্যায্যতার প্রতিফলন না দেখা যতো

বিশ্বকাপে অতিথি, কিন্তু নেই পূর্ণ স্বাধীনতা

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে এবারের বিশ্বকাপ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে আসা ইরান দলের জন্য বিশেষ ভিসা শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ইরান দল ম্যাচের মাত্র একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার দিনই দেশ ছাড়তে হবে।

অর্থাৎ অন্য দলগুলো যেখানে স্বাভাবিক প্রস্তুতি, অনুশীলন, আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং কৌশলগত পরিকল্পনার সুযোগ পাচ্ছে, সেখানে ইরানকে বারবার সীমান্ত পার হয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

ফুটবল ফেডারেশন অব ইরান (FFIRI)-এর মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়; এটি সরাসরি দলের প্রস্তুতি এবং পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের আগে আবারও প্রত্যাখ্যান

ইরানের দাবি ছিল খুবই সাধারণ।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচের আগে তারা দুই দিন আগে শহরে পৌঁছাতে চেয়েছিলো। তাদের কথা, ‘ ফিফা ভাই, ঠিকানা হোক তোমার ন্যায্যতাই’। কিন্তু ন্যায্য বা সঠিক আচরণ তো ফিফা করতে পারছেই না, নূন্যতম যেটুকু যা করা যায়, তাও তো ব্যবস্থা করতে পারছে না। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় ম্যাচ। খেলোয়াড়দের আবহাওয়া, সময়সূচি ও মাঠের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বাড়তি খানিক তো সময় প্রয়োজনই বটে।

কিন্তু সেই আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অবিচার হচ্ছে ইরানিদের সাথে।

ফেডারেশনের ভাষায়, অনুরোধ প্রত্যাখ্যান নয় মাত্র; বরং বারবার একই পরিস্থিতি সৃষ্টি করে একটি দলকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেবার এক দুরভিসন্ধিপূর্ণ ষড়যন্ত্র এটা।

তাদের অভিযোগ, ফিফার মূল নীতিই হলো সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তবে ইরান সেই সমান সুযোগ পাচ্ছে না। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে মরার উপর খাড়ার ঘা না হয়ে বরং ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ এর উপরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘা। 

যুদ্ধের ছায়া থেকে বিশ্বকাপের মাঠে

ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু থেকেই ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় নির্ধারিত বেস ক্যাম্প বাতিল করে শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর তিহুয়ানায় ঘাঁটি গড়ে।

তারপরও সমস্যার শেষ হয়নি। দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরুম স্টাফ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে তাদের টিকিট বরাদ্দও বাতিল করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের অভিযোগ আর শুধু ভ্রমণ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার অভিযোগ নয়;  বরং ফুটবলের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইনফান্তিনোর ড্রেসিংরুম সফর

নিউজিল্যান্ড ম্যাচের পর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ইরান ড্রেসিংরুমে উপস্থিতি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ কর্তা এমন সময়ে ইরান দলের সঙ্গে দেখা করলেন, যখন দেশটির অংশগ্রহণ নিয়েই নানা বিতর্ক ও উদ্বেগ ছিল। অনেকে  তাঁর এই সাক্ষাৎ- ফিফার পক্ষ থেকে এক ধরনের সংহতির বার্তা হিসেবে দেখছেন।

আবার সমালোচকেরা বলছেন, প্রতীকী সফর যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তব সমাধান।

কারণ ড্রেসিংরুমে সহানুভূতি দেখানো সহজ, কিন্তু সমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছে—ইরান এসব শর্ত জেনেই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে সম্মতি দিয়েছে।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান ম্যাচের আগের দিন প্রবেশ করতে পারবে এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই চলে যেতে হবে। পরবর্তী ম্যাচগুলোতেও একই নিয়ম কার্যকর থাকবে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এটি পূর্বনির্ধারিত ও সম্মত শর্ত।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কোনো দল যদি শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়, তবে কি  তা ন্যায়সঙ্গতও হয়ে যায়?

ফুটবলের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন

বিশ্বকাপ সবসময় শুধু গোল, ট্রফি আর নায়কদের গল্প নয়। এটি বিশ্ব রাজনীতির প্রতিচ্ছবিও। একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য, পরে যুগোস্লাভিয়া সংকট, আবার কখনও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ—ফুটবল বারবার দেখেছে রাজনীতির অভিঘাত।

২০২৬ বিশ্বকাপে সেই তালিকায় যুক্ত হলো ইরানের গল্প। এটি এমন এক গল্প, যেখানে একজন স্ট্রাইকারের দৌড়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সীমান্ত পার হওয়ার অনুমতি; কিংবা যেখানে ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের চেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ভিসার কাগজ।

মোদ্দা কথা,

বিশ্বকাপের ইতিহাসে হয়তো ইরান চ্যাম্পিয়ন হবে না। হয়তো তাদের যাত্রা গ্রুপপর্বেই থেমে যাবে। কিন্তু তারা এমন এক বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব ফুটবলের মৌলিক আদর্শকে প্রশ্ন করছে।

ফুটবল কি সত্যিই সবার জন্য সমান? নাকি বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসেও এখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অদৃশ্য রেখা আঁকা আছে?

ইরানের অভিযোগের উত্তর হয়তো ফিফা দেবে। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যাবে—মাঠে এগারো জনের বিরুদ্ধে এগারো জন খেলছে, নাকি কোনো কোনো দলকে লড়তে হচ্ছে আরও অদৃশ্য অনেক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে?

তবে ইরান বলেছে, এবার তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবেই ফিফার কাছে অভিযোগপত্র জমা দেবে। দরকার হলে, প্রতিবাদলিপি। আর এই অভিযোগপত্রের শেষ কোথায়, তা ও হয়তো অনুমেয়-ই। তবুও যেটুকু অন্তত করা সম্ভব, তা তো করতেই হয়! কারন- এই ইরান রাষ্ট্র হিসেবে হার মানেনি, আর পারস্য সভ্যতার মূর্ত প্রতীক হয়েই হয়তো-ইরান ফুটবল টিম নিজেদের ড্রেসিং রুম আর অফিশিয়ালদের কথোপকথনে বিড়বিড় করে বলছে- হার মেনো না বন্ধু, আমার।

হাল ছেড়ো না বন্ধু!