
এক সময় যে জমি বছরের সাত মাস পানির নিচে ডুবে থাকত, যেখানে আগাছা ছাড়া আর কিছুই জন্মাত না, সেই নিচু ও অবহেলিত জমিই আজ বুনছে লাখ লাখ টাকার স্বপ্ন। বরিশালের করমজা গ্রামের মানুষ যে জমিকে এক সময় ‘অনুৎপাদনশীল’ বা ‘মরা জমি’ বলে অবজ্ঞা করত, কৃষক গিয়াস উদ্দিন লিটুর পরিশ্রম আর বুদ্ধিমত্তায় সেই জমিই এখন হয়ে উঠেছে এক সোনার খনি। নিচু জমির অভিশাপকে আশীর্বাদে রূপান্তর করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে পৈতৃক এক একর জমি থেকেও বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা লাভ করা সম্ভব।
গিয়াস উদ্দিনের এই রূপান্তরের গল্পটি মোটেও সহজ ছিল না। এক সময় তিনি পল্লী বিদ্যুতের ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন। গ্রাহকের বাড়িতে মিটার বসানো বা লাইন মেরামতের সামান্য আয়ে ছয় সদস্যের বড় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে।
২০১২ সালে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জলাবদ্ধ এক একর জমিতে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করেন তিনি। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন বেড পদ্ধতিতে সবজি চাষ। প্রথমবারেই শসা আর তরমুজ আবাদ করে লাখ টাকা আয় তাঁর আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে; পেশা বদলে হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর আধুনিক কৃষক।
গিয়াস উদ্দিনের চাষাবাদ পদ্ধতিটি মূলত সমন্বিত কৃষি কৌশলের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি জলাবদ্ধ জমিতে মাটির প্রশস্ত পাড় দিয়ে ঘের তৈরি করেছেন। পাড়ের ওপর আবাদ করছেন লালশাক, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি আর পেঁপে।
এমনকি বিদেশি জাতের ৫০টি আমগাছও শোভা পাচ্ছে তাঁর খামারে। ঘেরের ভেতরে বাঁশ ও জালের মাচায় দুলছে লাউ, শসা আর হাইব্রিড তরমুজ। আর নিচে ঘেরের পানিতে খেলা করছে কার্পজাতীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এই মৌসুমে কেবল লালশাক বিক্রি করেই তিনি দুই লাখ টাকা আয় করেছেন এবং চলতি বছরে মাছ ও সবজি মিলিয়ে তাঁর আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে ২০ লাখ টাকা।
প্রকৃতির বৈরিতা আর অতিবৃষ্টির আঘাতও তাঁকে দমাতে পারেনি। ২০১৬ সালের ভয়াবহ বর্ষণে যখন পুরো খেত তলিয়ে গিয়েছিল, প্রতিবেশীদের কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও গিয়াস দমে যাননি। পুনরায় বীজ বুনে শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। আজ তাঁর এই সাফল্য কেবল নিজের পরিবারের স্বচ্ছলতাই ফেরায়নি বরং তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার কৃষি আইকন।
তাঁর বড় ছেলে রাকিবুল ইসলাম এবং বড় মেয়ে দুজনেই কৃষি ডিপ্লোমা শেষ করে বাবার এই কৃষি বিপ্লবের সারথি হয়েছেন। শিক্ষিত সন্তানরা এখন গর্বের সাথে মাঠেই নিজেদের ক্যারিয়ার খুঁজছেন।
গিয়াস উদ্দিনের এই ‘মডেল’ এখন ছড়িয়ে পড়ছে পুরো দক্ষিণাঞ্চলে। তাঁর পরামর্শে অন্তত ২০ জন কৃষক মাচা পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করে অভাব জয় করেছেন। এমনকি দূর-দূরান্তের কৃষকরাও তাঁর কাছে আসছেন পরামর্শ নিতে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নিচু এলাকার জলাবদ্ধতা যখন কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তখন গিয়াস উদ্দিনের উদ্ভাবনী কৌশলই হতে পারে আগামীর আধুনিক ও স্মার্ট কৃষির পথপ্রদর্শক। যে জমি এক সময় মরা ছিল, আজ সেখানে সবুজের সমারোহ আর লক্ষ লক্ষ টাকার হাসি -এটাই গিয়াস উদ্দিনের কৃষি সংগ্রামের সার্থকতা।









































