
ফাইল ছবি
বাংলাদেশে শীত মৌসুম এলেই তাপমাত্রা কতটা নিচে নামতে পারে—তা নিয়ে মানুষের কৌতূহল বাড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তরাঞ্চলে তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তবে ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, দেশে তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে নেমেছে একাধিকবার।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ৪৮টি আবহাওয়া স্টেশন রয়েছে। যদিও স্বাধীনতার আগে স্টেশনের সংখ্যা ছিল কম এবং অনেক জায়গায় ম্যানুয়াল থার্মোমিটারে তাপমাত্রা মাপা হতো, তবুও ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড সংরক্ষিত আছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে। সেবার পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। একই বছরে রংপুর বিভাগের সৈয়দপুরে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এছাড়া ২০১৮ সালেই উত্তরাঞ্চলের আরও কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা তিন ডিগ্রির ঘরে নেমে আসে। নীলফামারীর ডিমলায় ছিল ৩ দশমিক ০ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩ দশমিক ১ ডিগ্রি এবং দিনাজপুরে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
স্বাধীনতার আগের সময়েও দেশে তীব্র শীতের নজির রয়েছে। ১৯৬৪ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চার বছর পর, ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সেখানে তাপমাত্রা আরও কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় এই রেকর্ড অক্ষত থাকলেও, ঠিক ৫০ বছর পর ২০১৮ সালের শীতে সেই রেকর্ড ভেঙে যায়।
এর আগে ২০১৩ সালেও দেশের উত্তরাঞ্চলে তীব্র শীত দেখা দেয়। সে সময় রংপুরে তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি, দিনাজপুরে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি এবং সৈয়দপুরে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া ২০০৩ সালে রাজশাহীতে তাপমাত্রা নেমে এসেছিল ৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা এখনো অন্যতম সর্বনিম্ন রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল শৈত্যপ্রবাহের প্রবেশদ্বার হওয়ায় সেখানে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়। শীতকালে ভারতের দিল্লি, কাশ্মীর, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ অঞ্চল থেকে আসা হিমেল বাতাস পশ্চিমবঙ্গ হয়ে রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর বেল্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
এছাড়া উত্তরাঞ্চলে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ থাকায় রাতে তাপ দ্রুত বেরিয়ে যায়। সঙ্গে ঘন কুয়াশা সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে বাধা দেয়। ফলে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গিয়ে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ভারী কুয়াশাই শীত বেশি লাগার অন্যতম কারণ। কুয়াশা দীর্ঘসময় স্থায়ী হলে সূর্যের তাপ মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। পাশাপাশি দূষণের কারণে স্মগ ও কুয়াশা একসঙ্গে তৈরি হয়ে শীতের অনুভূতি বাড়ায়।
আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও শীতের ধরন বদলাচ্ছে। শীতের সময়কাল কমে আসছে, কিন্তু কুয়াশা বাড়ছে—ফলে তাপমাত্রা খুব বেশি না কমলেও শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের শীতের ইতিহাস বলছে—দেশে তাপমাত্রা তিন ডিগ্রির নিচে নামা নতুন নয়। তবে ঘন কুয়াশা, দূষণ ও আবহাওয়ার পরিবর্তিত ধরণ শীতকে আগের চেয়ে আরও কষ্টকর করে তুলছে।



































